ত্রিমুখী চাপে সরকার
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৩ AM

ত্রিমুখী চাপে সরকার

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩/০৪/২০২৬ ০৮:৪৯:৩৭ AM

ত্রিমুখী চাপে সরকার


রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মধুচন্দ্রিমার রেশ কাটতে না কাটতেই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং, ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির আতঙ্ক আর ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের চাপ সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে।

তারেক রহমান সরকারের শুরুটা বেশ ভালো। বলা যায় অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে ইকিবাচক ব্যতিক্রম। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের বেশ কিছু প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন শুরু করেছে— যা রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রত্যাশা ও সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

প্রথমত, সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন করে বিভিন্ন ধরনের ‘কার্ড’ চালুর উদ্যোগ দেখা গেছে। নিম্নআয়ের পরিবার, প্রবীণ নাগরিক, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সুবিধাভিত্তিক কার্ড চালুর ঘোষণা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপে পৌঁছেছে। এসব কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, চিকিৎসা সহায়তা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, কৃষি খাতে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব এখনও পুরোপুরি দৃশ্যমান না হলেও, নীতিগত সিদ্ধান্তটি কৃষকদের জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তৃতীয়ত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপের কিছু পদক্ষেপও চোখে পড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো, মনিটরিং জোরদার করা এবং আমদানি নীতিতে কিছু শিথিলতা আনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

এছাড়া প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকেই যাচ্ছে তারেক রহমান সরকার, যা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারা সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতার ওপর। এখন পর্যন্ত যে গতি দেখা যাচ্ছে, তা বজায় রাখা এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে এত কিছুর মধ্যে সরকার কিছুটা ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং, অন্যদিকে দেশজুড়ে চলমান ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির আতঙ্ক। এর পাশাপাশি ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের আলটিমেটাম সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলেছে। সব মিলিয়ে জনজীবনের ভোগান্তি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের প্রথম ও প্রধান ধাক্কা এসেছে জ্বালানি খাত থেকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া অস্থিরতার জেরে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য তিন থেকে চার কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।

সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেছেন, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানিভর্তি জাহাজ বন্দরে ভিড়ছে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় দেশজুড়ে দিনে ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধিকে সাধারণ মানুষের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে শুরু হওয়া ‘মব জাস্টিস’ বা ‘মব সন্ত্রাস’ বিএনপি সরকারের আমলেও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো ধরনের মব কালচার বরদাশত করা হবে না।’ কিন্তু সরকারের এই ঘোষণার পরও গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি দরবারে হামলা ও পীর নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এক পরিসংখ্যানে তুলে ধরে বলেছেন, মবের শিকার হয়ে আড়াইশ থেকে তিনশ মানুষ নিহত হয়েছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‘জাতীয় জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, দুদক ও গুম প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন না করায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বিরোধী দল ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং আমরা সামনের সারিতে থাকব।’

তবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। যেসব অধ্যাদেশ পাস হয়নি, সেগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আগামী অধিবেশনে উত্থাপন করা হবে এবং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে।’

জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদেও উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদ মুলতবি রেখে জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘সরকার বলছে তেলের সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সংকট নেই বলেই কি হাইকোর্টের মতো জায়গায় ভার্চ্যুয়ালি কোর্ট চলছে?’ জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জ্বালানির কোনো সংকট নেই; পাচার রোধেই সামান্য দাম বাড়ানো হয়েছে।’

চাপের মুখে থাকলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প খুঁজছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ভারত থেকে ১৭ হাজার টন ও সিঙ্গাপুর থেকে ১১ হাজার টন জ্বালানি এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির ফলে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে বলে আশা করছে সরকার।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এই সংকট তৈরি হলেও সরকার পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। মব সন্ত্রাসীদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জনগণের ভোগান্তি দূর করতে সরকার প্রয়োজনে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর