সংকুচিত হচ্ছে সুরমা, হারাচ্ছে স্বাভাবিক রূপ
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০২:৫৬ AM

সংকুচিত হচ্ছে সুরমা, হারাচ্ছে স্বাভাবিক রূপ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩/০৬/২০২৬ ১১:২৪:০৪ AM

সংকুচিত হচ্ছে সুরমা, হারাচ্ছে স্বাভাবিক রূপ


সংকুচিত হচ্ছে সিলেটের প্রাণ সুরমা নদী সুরমা| ৪৩ বছরে কমেছে ২৯ মিটার প্রস্থ| একই সঙ্গে নদীর গতিপথ, বাঁক ও প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে| অতিরিক্ত পলি জমা, অবৈধ বালু উত্তোলন, দখল ও দূষণের কারণে নদীটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে| এসব কারণে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক রূপ|

গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত পলি জমাই নদীটির প্রস্থ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ| বিশেষ করে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে ভয়াবহ বন্যার কারণে উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পলি এসে নদীতে জমা হয়| ওই সময়েই সবচেয়ে বেশি পলি জমার ঘটনা ঘটে|

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষণা বলছে, ১৯৭৮ সালে সুরমা নদীর গড় প্রস্থ ছিল ১৬৩ দশমিক ২০ মিটার| ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৪ দশমিক ৪৫ মিটারে| অর্থাৎ ৪৩ বছরে নদীটির গড় প্রস্থ কমেছে প্রায় ২৯ মিটার| তবে, ১৯৯৯ সালে নদীর গড় প্রস্থ নেমে গিয়েছিল মাত্র ৯৮ দশমিক ৬৫ মিটারে|

গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে নদীটির সংকোচন প্রবণতা স্পষ্ট| গবেষণা বলছে, ১৯৭৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে সুরমা নদীতে মোট পলি জমেছে ৩ হাজার ১৫৭ দশমিক ৮৪ একর এলাকায়| বিপরীতে ভাঙনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৭ একর ভূমি| অর্থাৎ ভাঙনের তুলনায় পলি জমার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ|

আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী আমেরিকান জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে প্রকাশিত শাবিপ্রবির গবেষণাটির শিরোনাম ছিল ‘স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিলেট জেলার সুরমা নদীর গঠনগত পরিবর্তনের বিশ্লেষণ’| গবেষণায় ১৯৭৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সুরমা নদীর গতিপথ, প্রস্থ, ভাঙন ও পলি জমাসহ গঠনগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে|

গবেষণায় নদীর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বা অংশ বিশ্লেষণ করা হয়| এতে দেখা যায়, কানাইঘাট, দক্ষিণ বানিগ্রাম ও লালারগাঁও এলাকায় নদীর গতিপথ সবচেয়ে বেশি বদলেছে| বিশেষ করে বলাউড়া বাজার এলাকায় নদীর বাম তীর ৬৬৩ দশমিক ৫১ মিটার এবং ডান তীর ৫৭২ দশমিক ৩৪ মিটার পর্যন্ত সরে গেছে| গবেষকরা জানান, নদীর বাম তীরে ক্ষয় ও সরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি| তবে ডান তীরেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে| দুই তীরের এই পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে নদীটি ক্রমেই সরু হয়ে পড়ছে|

গবেষণায় নদীর বাঁক বা ‘সিনুয়াসিটি ইনডেক্স’ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে নদীটি আরো আঁকাবাঁকা বা ‘মিয়ান্ডারিং’ চরিত্র ধারণ করছে| ১৯৭৮ সালে নদীর সামগ্রিক সিনুয়াসিটি ইনডেক্স ছিল ১ দশমিক ৬১, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮৫-এ|

গবেষণায় বলা হয়েছে, সুরমা নদী এখন উল্লেখযোগ্যভাবে তীর সরে যাওয়া, পলি জমা বৃদ্ধি, প্রস্থ কমে যাওয়া এবং অধিক আঁকাবাঁকা হয়ে পড়ার ˆবশিষ্ট্য বহন করছে| বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের পাহাড়ি নদীগুলো থেকে নেমে আসা বিপুল পলি, নদীদখল, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে|

গবেষণায় সতর্ক করা হয়, সুরমা নদীর ভারসাম্য নষ্ট হলে এর প্রভাব পড়বে সিলেট অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, নৌপথ, কৃষি ও সামগ্রিক পরিবেশব্যবস্থার ওপর| তাই নদী রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা|

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বাহাউদ্দিন শিকদার বলেন, নদীর পাশে যে এলাকাগুলো রয়েছে সেখানে অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে তুলার কারণে নদীর প্রস্থ দিনদিন কমে যাচ্ছে| নদীকে রক্ষায় সরকারকে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ ও নদীতে জমা পলি নিয়মিত খনন কাজের মাধ্যমে উত্তোলন করতে হবে|

তিনি বলেন, যদি নদী থেকে পলি উত্তোলন না করা হয়, তাহলে সিলেট অঞ্চলে বিগত দিনের মতো ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিতে পারে| নদীর গতিপথে যে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে হবে সেজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে|

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর