ক্যাকটাস বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাঁটায় ঢাকা কোনো নীরব উদ্ভিদের ছবি। দিনের আলোয় যার উপস্থিতি অনেকটাই সাদামাটা, রাত নামলেই সেই ক্যাকটাস যেন খুলে দেয় সৌন্দর্যের গোপন দুয়ার। কাঁটার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে ক্ষণস্থায়ী ফুল, যার সৌন্দর্য যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি বিস্ময়ও জাগায়।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিদ্যাবিল টি এস্টেটে দেখা মিলেছে এমনই এক ব্যতিক্রমী ক্যাকটাসের। সেরিয়াস গোত্রের এই কলামার ক্যাকটাসের সবুজ, খাড়া কাণ্ডের বিভিন্ন অংশে ফুটেছে সবুজ-হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল। বিরল এই দৃশ্য নজর কেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি উদ্ভিদপ্রেমীদেরও।
কাঁটায় ঢাকা স্তম্ভের মতো কাণ্ডটিই এই উদ্ভিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। পুরু ও মাংসল কাণ্ডজুড়ে রয়েছে স্পষ্ট পাঁজর, খাঁজ এবং অসংখ্য কাঁটা। সেই কাঁটার ফাঁকেই ফুটে ওঠা সবুজ-হলুদ ফুলগুলো যেন কঠিন আবরণের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোমল সৌন্দর্যের বার্তা দেয়।
উদ্ভিদবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেরিয়াস গোত্রের কলামার ক্যাকটাসের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। রাতের অন্ধকারে বড়, আকর্ষণীয় ও সুগন্ধি ফুল মেলাই এ ধরনের ক্যাকটাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সূর্য ডোবার পর ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলতে শুরু করে ফুল। তবে এই সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী নয়। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ফুলের জৌলুশ কমে আসে এবং কোনো কোনো ফুল সকালেই শুকিয়ে যায়। তাই পুরোপুরি প্রস্ফুটিত ফুল দেখতে হলে রাতের অপেক্ষাই করতে হয়।
বিদ্যাবিল টি এস্টেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্যাকটাসটি ঠিক কখন বা কার হাতে রোপণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কয়েক বছর আগে এটি রোপণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার বাগানের অন্য কোনো স্থান থেকে উদ্যানপালনের মাধ্যমে গাছটি এখানে এসে থাকতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ২০০ বছর আগে পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে ক্যাকটাসের আগমন ঘটে। সময়ের সঙ্গে শখের বাগান, উদ্যান ও বিভিন্ন সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে পড়ে এই উদ্ভিদের নানা প্রজাতি। বিশ্বজুড়ে ক্যাকটাসের রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। ফনিমনসা ওপানসিওয়াডি গোত্রের একটি পরিচিত ফুল, আর নাইট কুইন সেরেওয়াডি গোত্রের প্রসিদ্ধ ফুল হিসেবে পরিচিত। এ গোত্রের ক্যারনেজিয়া জাইগেনশিয়া প্রায় ৬০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। অন্যদিকে গোল্ডেন ব্যারেল বড় আকারের গোলাকৃতি ক্যাকটাস হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জীবন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, বিদ্যাবিলে পাওয়া উদ্ভিদটি সেরিয়াস গোত্রের কলামার ক্যাকটাস। এর পুরু ও খাড়া কাণ্ডে রয়েছে স্বতন্ত্র পাঁজর এবং অসংখ্য কাঁটা। রাতের বেলায় ফুল ফোটানো এ ধরনের ক্যাকটাসের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সূর্যাস্তের পর ফুল ফুটতে শুরু করে এবং পরদিন সকালেই তা শুকিয়ে যেতে পারে। ফলে ফুলকে পূর্ণ প্রস্ফুটিত অবস্থায় দেখতে হলে রাতেই গাছটি দেখতে হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন পাহাড়, জঙ্গল, পার্ক ও বাগানে বিচ্ছিন্নভাবে ক্যাকটাসের নানা প্রজাতি দেখা যায়। শুষ্ক ও পানি-স্বল্প পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতাই ক্যাকটাসকে অন্য অনেক উদ্ভিদ থেকে আলাদা করেছে। অনেক প্রজাতি তাদের মাংসল কাণ্ডে পানি সঞ্চয় করে রাখে। পাতার পরিবর্তে কাণ্ডই সালোকসংশ্লেষণের প্রধান দায়িত্ব পালন করে। কাঁটার পাশাপাশি কিছু ক্যাকটাসের অরিয়ল নামে পরিচিত রেশমের মতো মসৃণ রোমও থাকে। কোনো কোনো প্রজাতির রয়েছে ভেষজ গুণ, জলশোধন এবং পোকামাকড় তাড়ানোর ক্ষমতাও।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, সাধারণভাবে অনেকের ধারণা, ক্যাকটাস মানেই কাঁটায় ভরা উদ্ভিদ। কিন্তু বাস্তবে এমন বহু ক্যাকটাস রয়েছে, যেগুলো কাঁটার পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন ফুলও ধারণ করে। বিশ্বে প্রায় ১ হাজার ৮০০ প্রজাতির ক্যাকটাস রয়েছে এবং বাংলাদেশে পাওয়া যায় প্রায় ৪৬ প্রজাতি। এমনকি ড্রাগন ফলও ক্যাকটাস পরিবারের একটি উদ্ভিদ। পরিবেশগত গুরুত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ওষধি গুরুত্বও রয়েছে।
দিনের আলোয় কাঁটার আড়ালে নিশ্চুপ থাকা বিদ্যাবিলের এই ক্যাকটাস তাই রাত নামলেই যেন অন্য এক গল্প বলে। ক্ষণিকের জন্য ফুটে ওঠা সবুজ-হলুদ ফুলগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না; কখনো কখনো তার সবচেয়ে মুগ্ধকর রূপটুকু দেখতে হয় নীরব রাতের অপেক্ষায়।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি 








