কালচে ধানে ফিরেছে লোকসান, বোরো নিয়ে চরম বিপাকে জগন্নাথপুরের কৃষক
সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১১ PM

কালচে ধানে ফিরেছে লোকসান, বোরো নিয়ে চরম বিপাকে জগন্নাথপুরের কৃষক

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৭/০৮/২০২৬ ০২:৩২:৫৯ PM

কালচে ধানে ফিরেছে লোকসান, বোরো নিয়ে চরম বিপাকে জগন্নাথপুরের কৃষক


সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে বোরো ধান নিয়ে এবার একের পর এক সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। একদিকে হাওরের পানিতে তলিয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ পাকা ধান, অন্যদিকে কোনোভাবে উদ্ধার করা ফসল বাজারে তুলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। পানিতে ডুবে থাকা ধান শুকানোর পর কালচে হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা তা কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এমনকি সরকারি খাদ্য গুদামেও এসব ধান বিক্রি করতে পারছেন না কৃষকরা।

বোরো ধান জগন্নাথপুরের কৃষক পরিবারের জন্য শুধু একটি ফসল নয়, বরং সারা বছরের আর্থিক নির্ভরতার অন্যতম প্রধান উৎস। ধান বিক্রির অর্থ দিয়েই অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনা, বিয়ে, ঘরবাড়ি মেরামতসহ সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটায়। একই সঙ্গে পরবর্তী মৌসুমে জমি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও আসে এই ফসল বিক্রি থেকে। ফলে এবার বোরো নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট কৃষকদের সামনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে চলতি বোরো মৌসুমে হাওরের পানি দ্রুত বেড়ে যায়। এতে বহু এলাকার পাকা ধান কাটার আগেই পানির নিচে চলে যায়। সময়মতো ফসল তুলতে না পারা কৃষকদের কেউ কেউ নৌকা নিয়ে পানিতে নেমে ডুবন্ত ধান উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই ধান শুকানোর পর অনেক ক্ষেত্রেই কালচে রং ধারণ করে। ফলে বাজারে নিয়ে গেলেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

কৃষকদের অভিযোগ, স্বাভাবিক অবস্থায়ও এবার ধানের দাম তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। তার ওপর পানিতে নষ্ট হওয়া ধানের কোনো বাজার তৈরি হয়নি। ফলে যারা কিছুটা ধান রক্ষা করতে পেরেছেন, তারাও এখন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

মেঘারকান্দি গ্রামের কৃষক দ্বিজেশ দাস বলেন, এবার তিনি ১৫০ মণ বোরো ধান তুলেছেন। তাঁর হিসাবে, জমিতে আবাদ করা থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতি মণে খরচ হয়েছে অন্তত ৮০০ টাকা। কিন্তু সেই দামের কাছাকাছিও ধান বিক্রি করতে পারছেন না তিনি।

দ্বিজেশ দাস জানান, অনেক অনুরোধ করে ভালো ধান বিক্রি করতে চাইলে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা মণ এবং জলাবদ্ধতার পানি থেকে উদ্ধার করা কিছুটা কালচে ধানের জন্য প্রায় সাড়ে ৪০০ টাকা মণ দাম দিতে চায় ক্রেতারা। সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির সুযোগও তাঁর হয়নি। নানা অজুহাতে সেখানে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। এ অবস্থায় আগামী মৌসুমে আবার বোরো আবাদ করার মতো অর্থ হাতে থাকবে কি না, সেটিই এখন তাঁর বড় চিন্তা।

দাসনোওয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরণ দাসের অবস্থাও একই রকম। জলাবদ্ধতায় ফসল হারিয়ে তিনি জানান, এলাকার অনেক কৃষকই এখন দিশেহারা। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তিন মাসের জন্য নগদ অর্থ ও চাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁর মতে, এত অল্প সময়ের সহায়তায় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। পরবর্তী বোরো ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত সহায়তা অব্যাহত রাখার দাবি জানান তিনি।

সারদা চরণ বলেন, এবার এক হাল জমিতে বোরো চাষ করেও তিনি কোনো ধান ঘরে তুলতে পারেননি। ফলে পরের মৌসুমে বীজ, সার ও চাষের অন্যান্য খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

কৃষকদের এই দুরবস্থার মধ্যে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট থেকে সরকারি ধান কেনা বন্ধ রয়েছে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব আমিনুল হক সিপন বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে কৃষকরা ফসল ফলিয়েছেন। কিন্তু ফসল উৎপাদনের পর যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে ভবিষ্যতে কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদের আগ্রহ কমে যাবে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের পরিবারে নয়, দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাতেও পড়তে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তালিকা তৈরি করে তিন মাসের আর্থিক সহায়তা ও চাল দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ সেই তালিকায় স্থান পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জগন্নাথপুর পৌরসভা ও কয়েকটি ইউনিয়নে এ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।

জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের হিসাব বলছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন। শেষ পর্যন্ত ধান উত্তোলন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। প্রাথমিকভাবে ৮ হাজার কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও শেষ পর্যন্ত সহায়তা পেয়েছেন ৩ হাজার ৬০৩ জন।

জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, কৃষকরা নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে গেলেও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সরকারি বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে তাঁদের সহায়তা করা হচ্ছে। বোরো মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও আউশের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

অন্যদিকে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা (এলএসডি) শিবু ভূষণ পাল জানান, চলতি মৌসুমে জগন্নাথপুরে ১ হাজার ৯৮২ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। ৩ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ কার্যক্রম চালানোর কথা থাকলেও ৯ আগস্ট তা বন্ধ হয়ে যায়। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল জগন্নাথপুরের কৃষকদের জন্য এবারের মৌসুমটি শুধু ফসলহানির নয়, বরং ফসল হাতে পাওয়ার পরও তা বিক্রি করতে না পারার নতুন সংকট তৈরি করেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত ধান কেনার ব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং সরকারি সহায়তার আওতা বাড়ানো না হলে আগামী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়াই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর