আউশ পানির নিচে, আমন চাষও অনিশ্চিত: পাম্প হাউসে কৃষকের হাহাকার
সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২১ PM

কৃষকের আশীর্বাদ এখন অভিশাপ

আউশ পানির নিচে, আমন চাষও অনিশ্চিত: পাম্প হাউসে কৃষকের হাহাকার

রাজনগর (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৭/০৮/২০২৬ ১১:২৩:৪২ AM

আউশ পানির নিচে, আমন চাষও অনিশ্চিত: পাম্প হাউসে কৃষকের হাহাকার


মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত মনু সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউসটি একসময় হাওরপাড়ের কৃষকদের জন্য ছিল আশীর্বাদের মতো। কৃষিজমি জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা এবং হাওরের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছিল পাম্পগুলো। তবে বর্তমানে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় সেই পাম্প হাউসই কৃষকদের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

কাশিমপুর পাম্প হাউসের পাম্পগুলো দিয়ে পানি ধীরগতিতে নামায় বিস্তীর্ণ কাউয়াদীঘি হাওরের আউশ ও আমন ধানের জমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। কৃষকেরা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের দাবি জানালেও বর্তমান সক্ষমতায় হাওরের মাত্র দুই ফুট পানি কমাতেই প্রায় দুই মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওর এলাকার কৃষকেরা।

কৃষকদের ভাষ্য, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত কাউয়াদীঘি হাওরে এরই মধ্যে পাকা আউশ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। হাওরে দ্রুত পানি বাড়লেও পাম্পের মাধ্যমে তা নামতে দীর্ঘ সময় লাগছে। গত বোরো মৌসুমেও সময়মতো পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক তাদের ফসল পানির নিচে হারিয়েছিলেন।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সদর ও রাজনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নজুড়ে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে কাউয়াদীঘি হাওর বিস্তৃত। জলাবদ্ধতা দূর করে কৃষিজমি আবাদযোগ্য রাখার লক্ষ্যেই ১৯৭৬ সালে কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে মনু সেচ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১৯৮০ সালে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়। হাওরের অতিরিক্ত পানি কুশিয়ারা নদীতে সরিয়ে নিতে রাজনগরের কাশিমপুরে স্থাপন করা হয় আটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প। হাওরের পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ করে কৃষিকে সচল রাখাই ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।

কৃষকেরা বলছেন, হাওরের পানি যদি দুই থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত কমানো যায়, তাহলে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা সম্ভব হবে। এতে আনুমানিক সাড়ে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদন হতে পারে। কিন্তু পানি দ্রুত না কমায় সেই সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

কাশিমপুর পাম্প হাউসে মোট আটটি পাম্প থাকলেও সেগুলো নিয়মিত চালু রাখা হয় না বলে অভিযোগ কৃষকদের। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় পানি নিষ্কাশনের গতি আরও কমে যায়। তাদের দাবি, বর্তমান পাম্প ব্যবস্থাকে আধুনিক ও আরও কার্যকর করা জরুরি।

কৃষকেরা জানান, গত বোরো মৌসুমে তারা মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ ফসলও ঘরে তুলতে পারেননি। এবার আউশ ধানও পানিতে ডুবে গেছে। আমনের চারা রোপণের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও জমিতে পানি থাকায় অনেক কৃষক এখনো চাষাবাদ শুরু করতে পারছেন না।

রাজনগরের ফতেপুর ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, প্রায় দুই একর জমিতে আমনের চারা রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। এরই মধ্যে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হলেও পানিতে পুরো জমি ডুবে যাওয়ায় এখন চারা রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাজনগরের বালিগাঁও এলাকার বাসিন্দা তুহিন জুবায়েরের অভিযোগ, কাউয়াদীঘি হাওরের চারদিকে বাঁধ থাকায় পানি বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে হাওরে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির মৌলভীবাজার সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আলমপুর হোসেন বলেন, কাউয়াদীঘি হাওরে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি মানবসৃষ্ট। পাম্প নিয়মিত চালু রাখা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। দ্রুত দুই থেকে আড়াই ফুট পানি নামানো সম্ভব না হলে আমন চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব খছরু চৌধুরী বলেন, ২০০৪ সালে হাওরের বিলে থাকা পানির স্তর নির্ধারণের স্কেল সরিয়ে পাম্প হাউসের পাশের গভীর ক্যানেলে স্থাপন করা হয়। তার দাবি, এর ফলে বর্ষা ও শীত—দুই মৌসুমেই পানি আটকে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। প্রতি বছর একই ধরনের সমস্যা দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে হাওরের কৃষিনির্ভর ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকিতে পড়বে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ জানান, বর্তমানে হাওরের পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৬০ মিটার। অথচ পানির উচ্চতা সাড়ে আট মিটারের মধ্যে থাকার কথা। বর্তমান পাম্পিং সক্ষমতা অনুযায়ী বৃষ্টি না হলে হাওরের পানি দুই ফুট কমাতেও প্রায় ৫০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে এ জন্য পাম্পগুলো চালাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, পানি দ্রুত নিষ্কাশন করে আমন চাষের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর