৩৩ থেকে ৩৮ ডিগ্রি, দুই দশকে বদলে গেছে সিলেটের তাপমাত্রার চিত্র
বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৫৭ PM

৩৩ থেকে ৩৮ ডিগ্রি, দুই দশকে বদলে গেছে সিলেটের তাপমাত্রার চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯/০৮/২০২৬ ১২:২৯:১৪ PM

৩৩ থেকে ৩৮ ডিগ্রি, দুই দশকে বদলে গেছে সিলেটের তাপমাত্রার চিত্র


সিলেটের আবহাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। দিনের শুরুতে বৃষ্টি হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যাচ্ছে পুরো পরিস্থিতি। দুপুরের দিকে তীব্র রোদ ও গরমে জনজীবনে নেমে আসছে অস্বস্তি। আবার কোনো কোনো সময় টানা বর্ষণে নগরীর পাশাপাশি হাওর ও বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যাচ্ছে। বৃষ্টি থামার পরপরই শুরু হচ্ছে প্রচণ্ড গরম। ফলে কখনো বৃষ্টির পানি, আবার কখনো অসহনীয় তাপ দুই বিপরীত আবহাওয়ার সঙ্গে একই সময়ে মানিয়ে নিতে হচ্ছে সিলেটবাসীকে।

আবহাওয়ার এই দ্রুত রূপবদলের কারণে সিলেটে গ্রীষ্ম ও বর্ষার চেনা বৈশিষ্ট্যও অনেকটা পাল্টে গেছে। একদিকে আকাশজুড়ে মেঘ আর টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে হঠাৎ তীব্র রোদ—এমন বৈচিত্র্যময় পরিস্থিতি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অস্বস্তি তৈরি করছে। প্রকৃতিকন্যা সিলেটের আবহাওয়া যেন এখন নিজের নিয়মেই বদলে যাচ্ছে। কখনো বৃষ্টির পানিতে চারপাশ ডুবছে, আবার কখনো প্রচণ্ড তাপে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত দুই দশকে সিলেটে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বৃষ্টিপাতও বেড়েছে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি ও পরিবেশে, যার ফলে ঝুঁকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রার বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে সিলেট নগরী ধীরে ধীরে ‘হিট আইল্যান্ডে’ রূপ নিয়েছে। শহরের ভূপৃষ্ঠে তাপ শোষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উঁচু ভবন এবং এসির আউটডোর ইউনিট থেকে নির্গত তাপ। এসব কারণে নগরীর তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় সাত বছরে এই গড় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রেকর্ড অনুযায়ী, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় ২০২২ সালে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২১ সালে ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি, ২০২২ সালে ৩৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি, ২০২৩ সালে ৩৮ ডিগ্রি, ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি এবং ২০২৫ সালে ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত মাসে সিলেট আবহাওয়া অফিস এই তাপমাত্রা রেকর্ড করে।

অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ২০০৬ সালে একটি গবেষণায় সিলেট আবহাওয়া অফিসের ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে। সেই তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০২ সালে ৩২ দশমিক ৭ ডিগ্রি, ২০০৩ সালে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি, ২০০৪ সালে ৩৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি এবং ২০০৫ সালে ৩৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। ওই পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট শহরের ‘হিট আইল্যান্ড’ হয়ে ওঠার পেছনে তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাটিতে তাপ শোষণের জায়গা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উঁচু ভবন ও এসির আউটডোর ইউনিট থেকে বের হওয়া তাপ নগরীর পরিবেশকে আরও উষ্ণ করে তুলছে।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটেও তাপমাত্রা বাড়ছে। তবে এখানে গরম বেশি অনুভূত হওয়ার অন্যতম কারণ সিলেটের বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকা।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মাটিতে পড়া সূর্যের আলো জলাভূমি ও গাছপালা আংশিকভাবে শোষণ করে। কিন্তু জলাভূমি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে সেই তাপ সরাসরি ফিরে যাচ্ছে। এতে বায়ুমণ্ডলও উত্তপ্ত হচ্ছে। আবার প্রচুর মেঘের মধ্যে উষ্ণ বায়ুর সংঘর্ষের ফলে বজ্রপাত তৈরি হচ্ছে, যাতে প্রাণহানিও ঘটছে। হাওরে বজ্রপাতের অন্যতম কারণ হলো স্থানীয় পরিবেশের সূর্যের আলো ধারণ করার সক্ষমতা কমে যাওয়া। এর ফলে হিটিং ও কুলিং সিস্টেমেও পরিবর্তন এসেছে।

তিনি আরও বলেন, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহর বর্তমানে ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে। তাপমাত্রা শোষণের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নগর এলাকায় নেই। এর সঙ্গে উঁচু ভবন এবং এসির বাইরে থাকা আউটলেট থেকে নির্গত তাপ যুক্ত হওয়ায় শহরের তাপমাত্রা সবসময় বেশি থাকছে।

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সিলেটে অতিরিক্ত গরম এবং অতিরিক্ত নিম্ন তাপমাত্রার পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডেরও বড় প্রভাব রয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ভূমির তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। গত ৩০ বছরে হাওরের ভূমি ব্যবহারের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের নামে অনেক হাওরকে ছোট ছোট পুকুরের মতো করে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণ এবং হাওর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে নির্বিচারে গাছ কাটা হয়েছে। হাওরে হাউজবোট চলাচলের কারণেও পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি সিলেটে বৃষ্টিপাতও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দুই দশকের ব্যবধানে বৃষ্টিপাত বেড়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিলেটে বছরে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ৩ হাজার ৮০৮ মিলিমিটার। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে সেই গড় বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৬২৭ মিলিমিটার।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে সিলেটে ৩ হাজার ৪৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। ২০০২ সালে ৩ হাজার ৬৪০ মিলিমিটার, ২০০৩ সালে ৩ হাজার ৬৫৮ মিলিমিটার, ২০০৪ সালে ৪ হাজার ২৮০ মিলিমিটার এবং ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে সিলেটে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় ৪ হাজার ২২৮ মিলিমিটার। ২০২১ সালে ৩ হাজার ৩০৯ মিলিমিটার, ২০২২ সালে ৫ হাজার ১১৮ মিলিমিটার, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৩৩৭ মিলিমিটার, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ১৮৫ মিলিমিটার এবং ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৩৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সিলেট আবহাওয়া অফিস ২ হাজার ৮৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

২০০১ থেকে ২০০৫ সাল এবং ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের বৃষ্টিপাতের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুধু বর্ষাকালেই নয়, প্রাক-বর্ষা সময়েও বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মার্চ থেকে মে—এই প্রাক-বর্ষা সময়ে সিলেটে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৭২০ মিলিমিটার। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালে এসে সেই গড় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৯৫৭ মিলিমিটার।

শাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেটে বৃষ্টিপাতের অন্যতম প্রধান কারণ উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা এই বায়ু বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প বহন করে। পরে মেঘালয়ের পাদদেশে সেই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

তিনি বলেন, মৌসুমী বায়ু কতটা আগেভাগে আসবে, সেটি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল। মার্চ-এপ্রিল মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রচুর সূর্যালোক গ্রহণ করে এবং এর ফলে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। পরে বাতাসের মাধ্যমে সেই জলীয় বাষ্প আমাদের অঞ্চলে এসে বৃষ্টিপাত ঘটায়। মৌসুমী বায়ু এবার আগেভাগে চলে আসায় সিলেটে আগাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর