উন্নত জীবনের স্বপ্নে সমুদ্রপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ছয় যুবক। প্রায় ১৫-১৭ দিন থেকেই তাদের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না পরিবার। এতে চরম হতাশা-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পরিবার ও স্বজনরা। এর আগে একই পথে গ্রিস যাওয়ার সময় খাবার ও পানির সংকটে ভূমধ্যসাগরে ১১ জনের প্রাণহানির ঘটনার পর থেকে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবকেরও কোনো সন্ধান মিলছে না।
নিখোঁজ ছয় যুবক হলেন- জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বাঘময়না গ্রামের আখল মিয়ার ছেলে জুয়েল আহমদ টিপু (২৩), একই ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে হাবিব উল্লাহ (২৮), কলকলিয়া ইউনিয়নের হিজলা গ্রামের ছালিক মিয়ার ছেলে ইউসুফ আলী (২০), সৈয়দপুর-শাহারপাড়া ইউনিয়নের কুড়িকেয়ার গ্রামের মৃত আব্দুল কদ্দুছের ছেলে সায়েক মিয়া (২৪), চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া (মরলবাড়ি) গ্রামের জম্মাত আলীর ছেলে রুবেল মিয়া (৩৫) এবং জগন্নাথপুর পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের সাইফু মিয়া (২৬)।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দালাল চক্রের মাধ্যমে জনপ্রতি ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তিতে তাদের লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। গন্ধর্বপুর গ্রামের হাবিব উল্লাহর পরিবারের সঙ্গে পাঁচ মাস আগে ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজের মাধ্যমে তাকে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। গত ৩ আগস্ট রাতে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ‘গেমে’ ওঠেন হাবিব উল্লাহ। এরপর থেকে তার সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
হাবিব উল্লাহর বড় ভাই আব্দুল্লাহ বলেন, ‘গেইমের এক সপ্তাহ আগে তার (হাবিব) সাথে আমাদের কথা হয়েছিল। এরপর ৩ আগস্ট তার গেইম হয়। গেইম পর থেকে আমরা তার কোন খোঁজ পাচ্ছি না। এমনকি দালালও তার কোন খোঁজ দিতে পারছে না।’
একই ইউনিয়নের বাঘময়না গ্রামের জুয়েল আহমদ টিপু ছয় মাস আগে দিরাই উপজেলার এক দালালের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া যান। সেখান থেকে গত ৩ আগস্ট গ্রিসের উদ্দেশে ‘গেমে’ ওঠার পর তিনি নিখোঁজ হন।
জুয়েলের মামা সাফি তালুকদার বলেন, ‘৩ আগস্ট দুপুরে আমার বড় ভাইয়ের সাথে আমার ভাগনা শেষবারের মতো ফোনালাপ হয়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। তার চিন্তায় তার মা দিশেহারা হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তবে দালাল বলছে আমার ভাগনা নাকি মিশরের একটি হাসপাতালে জীবিত রয়েছে।’
হিজলা গ্রামের ইউসুফ আলী ও কুড়িকেয়ার গ্রামের সায়েক মিয়া দুই মাস আগে চিলাউড়া গ্রামের করিম নামের এক দালালের মাধ্যমে ২৬ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন। গত ১ জুলাই তারা দেশ ছাড়েন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় এক মাস আগে গ্রিসের উদ্দেশে ‘গেমে’ ওঠেন। এরপর থেকে তাঁদেরও কোনো খোঁজ নেই।
ইউসুফ আলীর বাবা ছালিক মিয়া বলেন, ‘আমার ছেলে ও আমার তালতো ভাই তারা দুইজন এক সাথে লিবিয়া যায় এবং তারা একই দিনে নিখোঁজ হয়। একমাসেও দালাল তাদের কোন খোঁজ দিতে পারেনি।’
এদিকে চিলাউড়া গ্রামের রুবেল মিয়া ও পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের সাইফু মিয়াও প্রায় এক মাস ধরে নিখোঁজ। সাইফু মিয়া গত ১৮ জুলাই লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ‘গেমে’ ওঠেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নিখোঁজ যুবকদের স্বজনেরা দিন-রাত উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। তাদের কেউই জানেন না, তাঁদের স্বজনেরা বেঁচে আছেন কি না। স্বজনদের ধারণা, গ্রিসে যাওয়ার পথে কোনো একটি স্থানে নৌকাটি আটকা পড়ে থাকতে পারে এবং নিখোঁজ যুবকেরা এখনো বেঁচে আছেন। সেই আশায় অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দীন বলেন, ‘আমরা নিখোঁজদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তাদের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছি।’
এদিকে গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে একটি রাবারের নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। সমুদ্রে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে জ্বালানি শেষ হয়ে যায় নৌকাটির। একই সঙ্গে দেখা দেয় খাবার ও পানির তীব্র সংকট। টানা ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার সময় অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








