সিলেটে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে অতিরিক্ত রোগী রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। একশ শয্যার হাম ডেডিকেটেড শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে বর্তমানে ১১৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ৩৮ শয্যার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগে মোট ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত এক মাসেই মারা গেছেন ৩৭ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিনের হিসাবে একের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রতিদিনই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক শিশু।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন করে ৭১ জন সন্দেহজনক হাম রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২০ জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৩ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চারজন ভর্তি হয়েছেন।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৩ জন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১১৭ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯৬ জন রয়েছেন। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় হাসপাতাল দুটিতে এক শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে চারজন, বিয়ানীবাজার ও জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইজন করে, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৩১ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নয়জন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগী ভর্তি রয়েছেন।
জেলাভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। সিলেটে সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছেন ৫২ জন, যার মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। হবিগঞ্জে সন্দেহজনক হাম রোগে ১৫ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে চারজন, মৌলভীবাজারে যথাক্রমে ১২ ও একজন এবং সুনামগঞ্জে ৫৬ ও একজন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ১৩৫ এবং নিশ্চিত হাম রোগে ১০ জন। ফলে বিভাগে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১৪৫ জনে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে সিলেটে হামের প্রকোপ শুরু হয়। মে মাসে সংক্রমণ বাড়তে থাকে এবং জুনে পরিস্থিতি ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়। এরপর প্রায় তিন মাস ধরে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় নিয়মিতই শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে হাম প্রতিরোধে টিকা ক্যাম্পেইন সম্পন্ন হলেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হাম ও উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে ১০০ শয্যার ডেডিকেটেড হাসপাতাল করা হয়। পাশাপাশি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮ শয্যার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডও হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নির্ধারিত শয্যাও এখন অপ্রতুল হয়ে পড়েছে।
এদিকে সংক্রমণ বাড়লেও স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম মূলত টিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই সীমিত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত ব্যাপকভাবে টিকা ক্যাম্পেইন চালিয়ে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে করা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সেখানকার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে রয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বর্তমানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার কাজ করছেন। তবে হাম নিয়ন্ত্রণে এর বাইরে উল্লেখযোগ্য নতুন কোনো কর্মসূচি নেই বলে জানা গেছে। এতে জনসচেতনতা বাড়ানো, শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা এবং শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ঢাকা ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে হামের প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে সিলেটে এখনো সংক্রমণ চলছে এবং প্রতিদিনই শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। হাম নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, এতদিন মনে করা হয়েছিল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা দেখতে পাচ্ছেন, প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে অন্তত চার থেকে পাঁচজন এখনো টিকা পায়নি।
সিভিল সার্জন আরও বলেন, শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক শিশু ৯ মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এই বয়সের আগে শিশুদের মায়ের কাছ থেকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পাওয়ার কথা। কিন্তু তারা কেন সেই প্রতিরোধ ক্ষমতা পাচ্ছে না, বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা এবং শিশু ও মায়েদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে না দেখা হলে সিলেটের হাম পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









