শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একাডেমিক ভবন ‘এ’-এর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ‘চেতনা ৭১’ এখন ক্ষতচিহ্ন আর অযত্নের সাক্ষী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভাস্কর্যটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সময়ের সঙ্গে স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য দুটিই নষ্ট হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলাদেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রের মুখাবয়ব আঘাতে বিকৃত হয়ে গেছে। দুই প্রতিকৃতির পায়ের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত। বেদিতে থাকা ‘চেতনা ৭১’ নামফলকটি নেই। দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচর্যার অভাবে প্রতিকৃতির গায়ে শ্যাওলা জমে কালচে দাগও পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাত ১২টার দিকে প্রায় অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেলে করে শতাধিক ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকেন। পরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ভাস্কর্যটিতে আঘাত করে ভাঙচুর করা হয়। তবে হামলায় জড়িতদের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
‘চেতনা ৭১’-এ ভাঙচুরের ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৩ সালেও ভাস্কর্যটিতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সে সময় এ ঘটনার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। পরে ভাস্কর্যটি সংস্কার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০০৫-০৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ‘চেতনা ৭১’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে প্রথম ব্যাচের (১৯৯০-৯১) শিক্ষার্থী এবং একটি বেসরকারি ব্যাংক আর্থিক সহায়তা দেয়। ২০০৯ সালের ২৬ মার্চ অস্থায়ীভাবে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়।
৬ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভাস্কর্যটির নকশা করেন শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল। নির্মাণকাজে যুক্ত ছিল তাঁর সংগঠন ‘নৃ’ এর স্কুল অব স্কালচার। নানা বাধা ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ২০১১ সালের ৩০ জুলাই ভাস্কর্যটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন ‘এ’-এর উত্তর-পশ্চিম পাশে তিন রাস্তার মোড়ের কর্ণারে স্থাপনাটি অবস্থিত। বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীদের আদলে এর নকশা করা হয়েছে। পোশাক ও আনুষঙ্গিক উপকরণেও রয়েছে সমকালীনতার ছাপ। ভাস্কর্যের ছাত্রের হাতে বাংলাদেশের পতাকা এবং ছাত্রীর হাতে রয়েছে একটি বই। বইটিকে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ভাস্কর্যটির মূল বেদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের আদলে তৈরি। সিরামিকের ইট দিয়ে তৈরি তিনটি প্লেটের ওপর বেদিটি স্থাপন করা হয়েছে। নিচের প্লেটটির ব্যাস ১৫ ফুট, মাঝেরটির সাড়ে ১৩ ফুট এবং ওপরেরটির ১২ ফুট। তিনটি প্লেটের ওপর রয়েছে ৪ ফুট উঁচু মূল বেদি। এর ওপর স্থাপন করা হয়েছে ৮ ফুট উঁচু দুটি প্রতিকৃতি।
একসময় শাবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীদের কাছেও ‘চেতনা ৭১’ ছিল আকর্ষণের জায়গা। ভাস্কর্য দেখতে এসে অনেকে ছবি তুলতেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মসূচিতেও স্থাপনাটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ভাস্কর্যকে ঘিরে মোমবাতি প্রজ্বালনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হতো। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এখন এসব আয়োজন আর চোখে পড়ে না।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আশিক বলেন, ‘চেতনা ৭১’ মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে নির্মিত সিলেটের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য এবং এটি শাবিপ্রবির অন্যতম নিদর্শন।
তাঁর ভাষ্য, ভাস্কর্যটি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী অসংখ্য শহীদের অবদানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর একদল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এতে আঘাত হানে। এরপর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয় শাবিপ্রবির একমাত্র ভাস্কর্যটি সংস্কার করা হয়নি।
মোহাম্মদ আশিক বলেন, এর অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের জন্মের প্রতীকের দিকেই নজর দিচ্ছে না। তাঁর দাবি, প্রশাসন দ্রুত ‘চেতনা ৭১’ সংস্কার করার পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির আওতায় আনুক।
স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মহুয়া মৃণ্ময় বলেন, ‘চেতনা ৭১’ কেবল একটি ভাস্কর্য নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার চেতনার দৃশ্যমান প্রতীক। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহাসিক ক্যাম্পাসে এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা দুঃখজনক।
তাঁর মতে, ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে ধারণ করে এমন উল্লেখযোগ্য কোনো ভাস্কর্য নেই। সে কারণে ‘চেতনা ৭১’-এর গুরুত্ব আরও বেশি। দ্রুত ভাস্কর্যটি সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করে যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলেও আশা করেন এই শিক্ষার্থী।
ভাস্কর্যটির বর্তমান অবস্থা ও সংস্কারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অল্প সময় হলো জয়েন (যোগদান) করেছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো সমস্যা আছে, সকল সমস্যা আমরা ধীরে ধীরে দেখব।’
আজকের সিলেট/ জেকেএস
শাবি প্রতিনিধি 








