মৌলভীবাজারে করাতকল ঘিরে বন উজাড়ের অভিযোগ
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৫ PM

মৌলভীবাজারে করাতকল ঘিরে বন উজাড়ের অভিযোগ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮/০৯/২০২৬ ১০:০৬:২৬ AM

মৌলভীবাজারে করাতকল ঘিরে বন উজাড়ের অভিযোগ


প্রায় ৫৩ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমির জেলা মৌলভীবাজারে বৈধ-অবৈধ করাতকলের বিস্তার নিয়ে বনজ সম্পদ উজাড়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আইন অমান্য করে কৃষিজমিতে গড়ে ওঠা এসব করাতকলে দিন-রাত চেরাই হচ্ছে সামাজিক বনায়ন ও বন থেকে চোরাই পথে আনা গাছ। এতে একদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বৃক্ষ আচ্ছাদন কমছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর বাড়ছে চাপ। পরিবেশকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, চোরাই গাছ করাতকলে পৌঁছানোর পর সেগুলো বৈধ না অবৈধ—তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সিলেট বিভাগীয় বন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১৯৩টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে ১৪২টির লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্সবিহীন ১৩টি করাতকল রয়েছে এবং উচ্চ আদালতে রিট ও স্বত্ব মামলায় রয়েছে আরও ৪০টি। জেলায় সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ৫৩ হাজার ১০৯ একর।

সরেজমিনে কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, সংরক্ষিত বন ও বিভিন্ন সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য করাতকল। এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে বৈধ-অবৈধ বিভিন্ন ধরনের গাছ এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সুযোগ বুঝে সেগুলো চেরাই ও বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বেশিরভাগ করাতকল কৃষিজমি ভরাট করে স্থাপন করা হয়েছে। কিছু করাতকলে রাতের আঁধারে গাছ চেরাই করা হয়। সড়কের পাশের গাছ, চা বাগানের ছায়া বৃক্ষ এবং বন থেকে চুরি করা গাছও এসব করাতকলে পৌঁছায় বলে অভিযোগ।

সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে অবৈধভাবে গাছ চেরাইয়ের প্রবণতা বাড়ছে। রাতের বেলায় চোরাই গাছ চেরাই করার কারণে তা সহজে নজরে আসে না। বন বিভাগের জনবল সংকটের সুযোগেও এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে তাদের দাবি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, সড়কের পাশ থেকে চুরি করা গাছ অনেক সময় করাতকলে আনা হয়। পরে বৈধ কাঠের সঙ্গে এসব গাছও বিক্রি করা হয়। গাছ চেরাই হয়ে যাওয়ার পর কোনটি চোরাই আর কোনটি বৈধ—তা বোঝার সুযোগ থাকে না।

করাতকলের কয়েকজন মালিকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলায় কিছু করাতকল অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে, আবার কেউ কেউ উচ্চ আদালতে রিট করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, তারা সাধারণত চোরাই কাঠ চেরাই করেন না। তবে কাঠ বৈধ না অবৈধ, সব সময় তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

তবে পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম অভিযোগ করেন, জেলায় অসংখ্য অবৈধ করাতকল থাকলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তাঁর দাবি, জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই কয়েকটি করে করাতকল রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত গাছ চুরি হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় প্রথমেই অবৈধ করাতকল বন্ধ করা প্রয়োজন।

তবে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অবৈধ করাতকল চালানোর সুযোগ দেওয়ার যে অভিযোগ পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম করেছেন, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি।

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে তাদের পক্ষে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য, পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিলেও করাতকলের লাইসেন্স দেয় বনবিভাগ।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, মৌলভীবাজারে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু লাইসেন্সবিহীন করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জেও একটি অবৈধ করাতকল বন্ধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যেসব করাতকলের কাগজপত্র রয়েছে, সেগুলোও প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। লাইসেন্সবিহীন করাতকলের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মো. আবদুর রহমান আরও বলেন, জেলায় অনেক সংরক্ষিত বন রয়েছে। অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও সিলগালা করা হচ্ছে। কিছু করাতকল উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। কোনো করাতকলে চোরাই কাঠ বিক্রি বা চেরাইয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর