মৌলভীবাজারের টমেটো চাষিদের দ্বিমুখী লড়াই
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৬ PM

গ্রাফটিংয়ে ফলন, বাজারে দুশ্চিন্তা

মৌলভীবাজারের টমেটো চাষিদের দ্বিমুখী লড়াই

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৬/০৯/২০২৬ ১০:৩২:৫৯ AM

মৌলভীবাজারের টমেটো চাষিদের দ্বিমুখী লড়াই


মাঠজুড়ে টমেটোর সবুজ-লাল সমারোহ, বাড়ির আঙিনায় গ্রাফটিং চারার ব্যস্ততা—মৌলভীবাজারে টমেটো চাষের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে আগাম ও রবি মৌসুমে টমেটো চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি টমেটো চাষ হচ্ছে কমলগঞ্জে। এখানকার টমেটো ও গ্রাফটিং টমেটোর চারা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

তবে উৎপাদন ও চারার বাণিজ্যে সম্ভাবনা থাকলেও বাজারে এসে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, টমেটো চাষে কৃষি বিভাগের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা মিলছে না। ঋণ নিয়ে চাষ করেও কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না তারা। এর মধ্যে সার, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে। বিপরীতে এ বছর টমেটোর দাম কম। দেশের বাইরে থেকে টমেটো ও কাঁচা মরিচ আমদানির প্রভাবেও বাজারে দাম কমেছে বলে মনে করছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। এতে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কমলগঞ্জে ক্লাস্টার ভিত্তিতে ও মালচিং পেপার ব্যবহার করে আগাম টমেটো চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। এ পদ্ধতিতে সারা জেলাতেই হচ্ছে টমেটো চাষ। খরিফ-১ ও রবি মৌসুমের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালেও টমেটো চাষ করে সফলতার মুখ দেখছেন কৃষকরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় আগাম জাতের টমেটো খরিফ-১ চাষে।

জেলায় এ বছর ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে হয়েছে রবি টমেটোর আবাদ। এর মধ্যে আগাম জাতের খরিফ-১ মৌসুমে ১৩০ হেক্টর জমিতে এবং গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ হয়েছে ১৯ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত উৎপাদিত হয়েছে ৬৫ লাখের ওপরে টমেটোর চারা। প্রতিটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

কৃষক আলাউদ্দিন, উদ্যোক্তা আবু তাহের, কৃষক বদরুজ্জামান বাবু, স্বপন কুমার সিংহ, কিষানি সখিনা বিবিসহ অনেক কৃষক জানান, সার ও কীটনাশকের দাম প্রচণ্ড বেড়েছে। তাছাড়া যে কীটনাশক তারা ব্যবহার করেন, তাতেও রোগবালাই সারে না।

তাদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তারা কখনো তাদের টমেটো বা গ্রাফটিং চারা দেখতে আসেন না কিংবা কোনো পরামর্শ দেন না। সরকারি কোনো প্রণোদনাও তারা পান না। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

শুকুরউল্লাগাঁওয়ের তরুণ উদ্যোক্তা কৃষক আব্দুল মান্নান চলতি বছরে প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে আগাম টমেটো আবাদ করেছেন। এতে তার উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। কিন্তু উৎপাদনের পর নানা সমস্যায় পড়েছেন তিনি।

আব্দুল মান্নান জানান, গত বছরের তুলনায় অনেক কম দামে টমেটো বিক্রি করতে হচ্ছে। সবকিছুর দাম চড়া, অথচ সরকারের সহযোগিতা নেই।

তবে গ্রাফটিং চারা ও আগাম পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করে লাভবান হচ্ছেন আব্দুল করিম, জলিল, তাহের, আব্দুল মতিনসহ অনেক কৃষক। এ পদ্ধতিতে ফলনও ভালো হয় বলে জানিয়েছেন তারা।

কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই এখন টমেটোর বিস্তৃত আবাদ। বিশেষ করে আদমপুর, মাধবপুর, ইসলামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যতদূর চোখ যায়, মাঠের পর মাঠজুড়ে টমেটো ক্ষেত। পাশাপাশি রয়েছে গ্রাফটিং টমেটোর শেড।

শুধু মাঠ নয়, অনেক বাড়িতেই এখন তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং টমেটোর চারা। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর বাড়তি চারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন কৃষকরা। ফলে টমেটো চাষের পাশাপাশি গ্রাফটিং চারাও হয়ে উঠেছে অনেকের বাড়তি আয়ের উৎস।

টমেটো গ্রাফটিং চারা ও টমেটো চাষের বিভিন্ন সম্ভাবনার দিক তুলে ধরে কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রাকিবুল ইসলাম জানালেন, ৬০ হেক্টর জায়গায় আগাম টমেটো চাষ হয়েছে।

টমেটো চাষিদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রণোদনা এবং নদীর বাঁধ মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কমলগঞ্জ উপজেলা কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার তালুকদার। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৩৮০ জন কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, এখনো কাজ চলমান রয়েছে।

তবে উৎপাদিত টমেটো সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নিয়ে এখনো সুখবর দিতে পারছেন না জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন। তিনি জানান, হিমাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও জানান, উপসহকারী কম থাকায় সঠিক সময়ে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে না পারলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

ফলে একদিকে গ্রাফটিং পদ্ধতি ও আগাম চাষে বাড়ছে ফলন ও সম্ভাবনা, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও সহযোগিতার ঘাটতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন মৌলভীবাজারের টমেটো চাষি ও উদ্যোক্তারা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর