সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৭ অপরাহ্ন

মহাঅষ্টমীতে দেবী আরাধনা, অঞ্জলি ও কুমারী পূজায় মুখর সিলেট

জনি কান্ত শর্মা

প্রকাশিত: ১৯/১০/২০২৬ ১২:৩৬:০০ অপরাহ্ন

মহাঅষ্টমীতে দেবী আরাধনা, অঞ্জলি ও কুমারী পূজায় মুখর সিলেট

নগরীর দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরে অবস্থিত শ্রীশ্রী মহালক্ষ্মী ভৈরবী গ্রীবা মহাপীঠে দেবী কুমারী। ছবি: সোহেল আহমেদ


শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর শিউলির সুবাসে প্রকৃতি যখন সাজে উৎসবের রঙে, তখন ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। দেবীর আগমনী সুরে ভক্তির আবেশ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। শারদীয় দুর্গোৎসবের এমনই এক পবিত্র দিন মহাঅষ্টমী। দেবীর আরাধনা, পুষ্পাঞ্জলি ও কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পালন করছেন দিনটি। তাঁদের প্রার্থনায় ধ্বনিত হচ্ছে শান্তি, মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও অশুভ শক্তির বিনাশের আকাঙ্ক্ষা।

সোমবার মহাঅষ্টমী উপলক্ষে সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরে অবস্থিত শ্রীশ্রী মহালক্ষ্মী ভৈরবী গ্রীবা মহাপীঠে সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমারী পূজা। এ ছাড়া মহাঅষ্টমীর অঞ্জলি ও অন্যান্য ধর্মীয় আচারেও অংশ নেন হাজারো ভক্ত। সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এবার ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে কুমারী পূজার আয়োজন হচ্ছে শুধু জৈনপুরের এই মহাপীঠে।

মহাঅষ্টমীর অন্যতম আকর্ষণ কুমারী পূজা। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে একটি কন্যাশিশুর মধ্যে দেবী দুর্গার প্রতীকী উপস্থিতি কল্পনা করে তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে পূজা করা হয়। কুমারীর নিষ্পাপ রূপের মধ্য দিয়ে দেবীর পবিত্রতা, স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টিশীল শক্তির প্রকাশ কল্পনা করেন ভক্তরা।

শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যে নারীকে আদ্যাশক্তির প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই কুমারী পূজার প্রচলন। এখানে দেবীশক্তির আরাধনা কেবল প্রতিমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; জীবন্ত মানবী ও কন্যাশিশুর মধ্যেও মাতৃশক্তির প্রতীকী রূপ খুঁজে নেওয়া হয়।

সাধারণত দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে অঞ্চল, মঠ-মন্দির ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী নবমী তিথিতেও এ পূজা হতে পারে। প্রচলিত রীতি অনুসারে, নির্দিষ্ট বয়সের একটি কন্যাশিশুকে পূজার জন্য নির্বাচন করা হয়। স্নান করিয়ে নতুন পোশাক ও অলংকারে সাজানোর পর তাঁকে পূজার আসনে বসানো হয়। এরপর মন্ত্রপাঠ, পুষ্প, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে দেবীরূপে আরাধনা করা হয়। পূজা শেষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং প্রসাদ বা আহার দেওয়ার রীতিও রয়েছে। তবে কুমারীর বয়স নির্বাচন, মন্ত্র ও আনুষ্ঠানিকতায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় পরম্পরা অনুযায়ী ভিন্নতা দেখা যায়।

এই পূজার তাৎপর্য ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে নারী ও কন্যাশিশুর মর্যাদার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতিটি কন্যাশিশু যেন ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তার পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে নারীশক্তির আরাধনার মধ্য দিয়ে এমন মানবিক প্রত্যাশাও প্রতিফলিত হয়।

মহাঅষ্টমীর সকালে পূজামণ্ডপে ভক্তদের অন্যতম প্রধান আয়োজন পুষ্পাঞ্জলি। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের সঙ্গে দেবীর চরণে ফুল নিবেদন করে ভক্তরা প্রার্থনা করেন শক্তি, সাহস, শান্তি ও কল্যাণের। অনেকেই এদিন উপবাস বা নিরামিষ আহার পালন করেন। তবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে।

দেবীর শক্তিরূপের বন্দনায় উচ্চারিত হয় শাস্ত্রের অমর পঙ্‌ক্তি;

‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।  

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।’

অর্থাৎ, যিনি সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শক্তিরূপে বিরাজমান, সেই দেবীকে বারবার প্রণাম।

এই মন্ত্রে ভক্তরা স্মরণ করেন সৃষ্টির অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি, সাহস এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভের চিরন্তন সংগ্রামের কথা। দেবী দুর্গার আরাধনায় তাঁরা কামনা করেন অকল্যাণের অবসান, মানুষের জীবনে স্বস্তি এবং সমাজে সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠা।

মহাঅষ্টমীর ধর্মীয় আচারগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে সন্ধিপূজার। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শাক্ত ঐতিহ্যে এই সময়কে বিশেষ পবিত্র বলে বিবেচনা করা হয়।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার চণ্ডিকা বা চামুণ্ডা রূপের আরাধনার সঙ্গে সন্ধিপূজার সম্পর্ক রয়েছে। এ সময় প্রদীপ, পুষ্প ও অন্যান্য উপচার নিবেদনের পাশাপাশি অনেক পূজামণ্ডপে ১০৮টি পদ্ম ও ১০৮টি প্রদীপ ব্যবহারের রীতি রয়েছে। এ ছাড়া কিছু অঞ্চলে মহাঅষ্টমীতে অস্ত্রপূজা ও অন্যান্য বিশেষ আচারও পালিত হয়। তবে সব মণ্ডপে একই ধরনের আয়োজন থাকে না; পূজার বিধান নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রীয় পরম্পরা ও স্থানীয় রীতির ওপর।

শরতের আবহে সিলেটের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে নগরের বিভিন্ন প্রান্তে পূজামণ্ডপগুলো সেজেছে নিজস্ব সাজসজ্জা ও আয়োজনে। কোথাও ঢাকের বাদ্য, কোথাও শঙ্খধ্বনি, আবার কোথাও ভক্তদের সম্মিলিত প্রার্থনায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ।

এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে ৪৭৪টি মণ্ডপ রয়েছে। এসবের মধ্যে ৪৪৮টি সর্বজনীন এবং ২৬টি পারিবারিক পূজামণ্ডপ। অন্যদিকে, মহানগর এলাকায় রয়েছে ১৬৩টি মণ্ডপ; এর মধ্যে ১৪৭টি সর্বজনীন ও ১৬টি পারিবারিক।

প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব আয়োজন, সাজসজ্জা ও আরাধনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে উৎসবের বৈচিত্র্য। তবে নগরীর দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরে অবস্থিত শ্রীশ্রী মহালক্ষ্মী ভৈরবী গ্রীবা মহাপীঠেই হচ্ছে কুমারী পূজার বিশেষ আয়োজন।

মহাঅষ্টমী শুধু একটি ধর্মীয় তিথি নয়; এটি আত্মশক্তি জাগানো, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের বিজয় কামনা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চারও উপলক্ষ। দেবী দুর্গার দশ হাতে যেমন শক্তি ও সুরক্ষার প্রতীক ফুটে ওঠে, তেমনি কুমারীর কোমল মুখে প্রতিফলিত হয় স্নেহ, পবিত্রতা ও নতুন জীবনের সম্ভাবনা।

ধূপের সুবাস, ঢাকের বাদ্য আর মন্ত্রোচ্চারণের আবহে দেবীর চরণে অঞ্জলি দিতে এসে ভক্তরা প্রার্থনা করেন পৃথিবী হোক শান্তিময়, মানুষের জীবনে আসুক সাহস ও স্বস্তি, দূর হোক সব অশুভ শক্তি। প্রতিটি কন্যাশিশু বেড়ে উঠুক ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তার পরিবেশে।

শরতের স্নিগ্ধতা আর উৎসবের আবেশে মহাঅষ্টমী তাই হয়ে উঠুক শক্তি ও পবিত্রতার আরাধনা, নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিভেদ পেরিয়ে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার দিন। দেবীর বন্দনায় ভক্তদের প্রত্যাশা অশুভের অবসান ঘটুক, শুভের জয় হোক, মানুষের জীবন ভরে উঠুক শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর