মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ন

মাটির নিচে আদা, মাচার ওপরে সবজির সবুজ স্বপ্ন

হবিগঞ্জের বাহুবলে একই জমিতে দুই স্তরে চাষাবাদ, কৃষক আব্দুস সাত্তারের সাফল্যে নতুন সম্ভাবনা

বাহুবল (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭/১০/২০২৬ ১০:৫৮:২২ পূর্বাহ্ন

হবিগঞ্জের বাহুবলে একই জমিতে দুই স্তরে চাষাবাদ, কৃষক আব্দুস সাত্তারের সাফল্যে নতুন সম্ভাবনা


মাটির গভীরে বেড়ে উঠছে আদা, আর মাথার ওপর বাঁশ ও তারের মাচাজুড়ে সবুজ পাতার ফাঁকে দুলছে নানা সবজি। একই জমি, অথচ ফসলের আয়োজন দুই স্তরে। মাটির নিচে আদার সম্ভাবনা, ওপরে সবজির সমারোহ প্রকৃতির সঙ্গে বুদ্ধি আর পরিশ্রমের মেলবন্ধনে কৃষিজমিকে যেন আয়ের দ্বিগুণ ঠিকানায় রূপ দিয়েছেন হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ছিলামী গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার।

তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুধু একটি জমির চিত্রই বদলায়নি, খুলে দিয়েছে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার জানালা। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম আর কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে একই জমিতে একের পর এক ফসল ফলিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, জমির পরিসর না বাড়িয়েও বাড়ানো যায় উৎপাদন ও আয়ের সুযোগ।

প্রচলিত কৃষিপদ্ধতিতে যেখানে একটি জমিতে একটি ফসলই প্রধান ভরসা, সেখানে আব্দুস সাত্তার বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। মাটির নিচে আদা চাষের পাশাপাশি মাচায় ফলিয়েছেন জিঙ্গা, বরবটি, লাউ ও শিম। সবজির সবুজ সমারোহ ইতোমধ্যে এনে দিয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এখনো জমিতে বেড়ে উঠছে আদা, আর মাচায় শিমের ফলনের অপেক্ষা। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আদা ও শিম বিক্রি করে আরও দেড় লাখ টাকার বেশি আয়ের স্বপ্ন দেখছেন এই কৃষক।

সম্প্রতি ছিলামী গ্রামে তার ফসলের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, একই জমিতে যেন কৃষির দুই ভুবন। নিচে মাটির আড়ালে বেড়ে উঠছে আদা, আর ওপরে মাচাজুড়ে ছড়িয়ে আছে লাউ ও শিমের গাছ। সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে সম্ভাবনাময় ফলন। জমির প্রতিটি স্তরকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয়ের যে স্বপ্ন তিনি বুনেছেন, তারই দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি এই ক্ষেত।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আব্দুস সাত্তার বলেন, কৃষিকাজে শ্রমের বিকল্প নেই। তবে শুধু পরিশ্রম করলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে না; প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। শ্রমের সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ যুক্ত হলে কৃষিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

চলতি মৌসুমে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ক্রিপার প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে প্রায় ২০ শতক জমিতে আদা চাষ শুরু করেন আব্দুস সাত্তার। এ সময় তাকে নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদের পরামর্শ দেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম।

আদা চাষের পাশাপাশি জমির ওপরের অংশও যাতে অনাবাদি পড়ে না থাকে, সে চিন্তা থেকেই মাচায় সবজি চাষের পরামর্শ দেন তিনি। পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে বাঁশ ও তার দিয়ে তৈরি করা হয় মাচা। প্রথমে সেখানে চাষ করা হয় জিঙ্গা ও বরবটি। সেসব ফসল সংগ্রহের পর একই মাচায় জায়গা করে নেয় লাউ ও শিমের গাছ।

এভাবেই একই জমিতে এক ফসলের পর আরেক ফসলের চাষাবাদে তৈরি হয়েছে বাড়তি আয়ের পথ। জমির ওপরের অংশ থেকে সবজি বিক্রির টাকা ইতোমধ্যে ঘরে এসেছে, আর মাটির নিচে আদা বেড়ে উঠছে ভবিষ্যতের আয়ের আশায়। বর্তমানে মাচায় লাউ চাষ রয়েছে শেষ পর্যায়ে। শিম ধরারও সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, আদা তোলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক মাস।

আব্দুস সাত্তারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আদা ও মাচায় সবজি চাষে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে জিঙ্গা, বরবটি ও লাউ বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত সবজি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তার মোট উৎপাদন খরচের পাঁচ গুণ।

তবে এই হিসাবের শেষ পাতা এখনো লেখা হয়নি। জমিতে রয়ে গেছে আদা, মাচায় রয়েছে শিমের সম্ভাবনা। ফসল সংগ্রহ ও বিক্রি শেষে চূড়ান্ত আয়-ব্যয়ের হিসাব জানা যাবে। তবু বর্তমান ফলন ও অভিজ্ঞতা থেকে আশাবাদী আব্দুস সাত্তার। তার প্রত্যাশা, আদা ও শিম বিক্রি করে আরও দেড় লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারবেন।

কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘কৃষিকাজে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তবে কোন জমিতে কী চাষ করলে বেশি লাভ হবে, সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ থাকাও জরুরি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীমের পরামর্শে আদার পাশাপাশি মাচায় সবজি চাষ করেছি। এতে আমি লাভবান হয়েছি। তার পরামর্শ আমার কাজে এসেছে। এ জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ।’

আব্দুস সাত্তারের জমিতে এখন শুধু ফসলের বেড়ে ওঠা নয়, বেড়ে উঠছে আশপাশের কৃষকদের আগ্রহও। তার ব্যতিক্রমী চাষাবাদ দেখে অনেকেই একই জমিতে আদার পাশাপাশি মাচায় সবজি চাষের কথা ভাবছেন। একটি জমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে কীভাবে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করা যায়, আব্দুস সাত্তারের উদ্যোগ তাদের সামনে সেই সম্ভাবনাই তুলে ধরেছে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, সঠিক পরামর্শ, পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে আব্দুস সাত্তার যে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে। একটি জমিতে শুধু একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে উপযুক্ত পদ্ধতিতে একাধিক ফসল চাষ করা গেলে বাড়তে পারে জমির ব্যবহার, তৈরি হতে পারে বাড়তি আয়ের সুযোগ। তাই তার দেখানো পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেক কৃষক।

কৃষকদের কাছে জমি কেবল মাটির একটি খণ্ড নয়; এটি জীবিকা, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার ক্ষেত্র। সেই জমির প্রতিটি স্তরকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর যে প্রয়াস আব্দুস সাত্তার দেখিয়েছেন, তা কৃষিতে পরিকল্পিত চাষাবাদের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম বলেন, একই জমিতে পরিকল্পিতভাবে একাধিক ফসল চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। কৃষক আব্দুস সাত্তার তার বাস্তব উদাহরণ দেখিয়েছেন। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ অনুসরণ করলে কৃষকেরা জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত চাষপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে সহায়তা করা গেলে কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, সঠিক পরামর্শ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী চাষাবাদ করলে কৃষকের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই জমিতে ফসল চাষের আগে পরিকল্পনা নির্ধারণ করা জরুরি। কোন জমিতে কোন ফসলের সঙ্গে অন্য ফসল চাষ করা সম্ভব, তা বিবেচনায় নিয়ে চাষাবাদ করতে হবে। কৃষক আব্দুস সাত্তার পরিকল্পিত চাষাবাদের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছেন।

মাটির নিচে আদা, মাচার ওপরে সবজি, আব্দুস সাত্তারের এই উদ্যোগ যেন একই জমিতে বোনা দুই সম্ভাবনার গল্প। একদিকে বর্তমানের সবজি বিক্রির আয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতের আদা ও শিমের প্রত্যাশা। তার ক্ষেতের সবুজ পাতার ফাঁকে তাই শুধু ফসলই বেড়ে উঠছে না, বেড়ে উঠছে নতুন চিন্তা, বাড়তি আয়ের স্বপ্ন আর কৃষিতে সম্ভাবনার এক আশাবাদী বার্তা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর