হাসপাতালের জানালার গ্রিলে ঝুলছে স্যালাইন, মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে আছেন রোগীরা, বারান্দা থেকে সিঁড়ির নিচ পর্যন্ত মানুষের ভিড়। কোথাও একটি শয্যায় দুজন রোগীর ঠাঁই হয়েছে, কোথাও আবার শয্যার অপেক্ষায় মেঝেই হয়ে উঠেছে চিকিৎসার শেষ আশ্রয়। চিকিৎসা পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এসে এমনই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীরা। চিকিৎসক ও জনবলের অভাবের সঙ্গে বাড়তি রোগীর চাপ মিলিয়ে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন বিপর্যয়ের মুখে।
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩২ জন চিকিৎসকের পদ ফাঁকা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১২ জন। অন্যদিকে, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৬০ থেকে ১৭০ জন রোগী ভর্তি থাকছেন। পাশাপাশি বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসছেন শত শত মানুষ। ফলে নির্ধারিত শয্যায় রোগীদের জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে।
সম্প্রতি হাসপাতালটি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ৫০টি বেডের প্রতিটিতে দুজন করে রোগী শুয়ে আছেন। রোগীর চাপে ওয়ার্ডগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। শয্যা না পেয়ে অনেকে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির নিচে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। জানালার গ্রিলে ঝুলছে স্যালাইন। হাসপাতালের প্রতিটি জায়গায় যেন ফুটে উঠেছে রোগীর চাপ ও শয্যাসংকটের চিত্র।
উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন থেকে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ষাটোর্ধ্ব জমির আলী। তিন দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করেও একটি শয্যা না পাওয়ার কষ্ট জানিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তিন দিন ধইরা বাবারে লইয়া আইছি। একটা সিট পাইছি না, নিচেই শুইয়া আছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে (আউটডোর) চিকিৎসা নিতে আসেন ৫শ থেকে ৬শ রোগী। তাঁদের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এ ছাড়া জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় আসেন আরও শতাধিক রোগী। এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলানোর দায়িত্বে রয়েছেন সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক। বর্তমানে কর্মরত ১২ জনের মধ্যে ২ জন প্রশিক্ষণে এবং ১ জন ছুটিতে থাকায় মাত্র ৯ জন চিকিৎসক দিয়ে পুরো হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসকদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্তব্যরত এক চিকিৎসক বলেন, আমরা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করেও কুলিয়ে উঠতে পারছি না। একজন চিকিৎসককে তিনজনের কাজ করতে হচ্ছে।
চিকিৎসকের পাশাপাশি হাসপাতালটিতে নার্স ও অন্যান্য কর্মীর সংকটও প্রকট। ৩২টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন। বহির্বিভাগে ওষুধ বিতরণের জন্য ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য রয়েছে। ১৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর প্রয়োজন হলেও কাজ করছেন মাত্র তিনজন। এ ছাড়া টিকিট কাউন্টারে কোনো ক্লার্ক না থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।
এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দিয়েও সুফল মিলছে না। ৩২ জনের জায়গায় ১২ জন দিয়ে তিন লক্ষাধিক মানুষের সেবা দেওয়া অসম্ভব। মানবিক কারণে আমরা কোনো রোগীকে ফেরাতে পারি না, তাই বাধ্য হয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা দিচ্ছি। ৫০ শয্যা থেকে হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।
চুনারুঘাট প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চুনারুঘাট একটি বড় উপজেলা, যেখানে চা-শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাদের একমাত্র ভরসা এই সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু এখানে চিকিৎসক ও শয্যা নেই। আমরা অবিলম্বে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।
শুধু চিকিৎসক, নার্স ও শয্যাসংকটই নয়, হাসপাতালের অবকাঠামো নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি 








