সবুজ প্রকৃতি, পুকুর-দীঘি আর উঁচু, নিচু আর পাহাড় টিলার শহর হিসেবে সিলেটের আলাদা পরিচিতি দেশজুড়ে। শহরের উত্তর-পূর্ব সীমা ধরে মাত্র কিলো তিন গেলেই দেখা মিলে সবুজ চা বাগান আর টিলার। তবে ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি সিলেটের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এই দৃশ্য এখন অনেকটাই মলিনের পথে। দেখা মিলেনা আগের মতো আর পাহাড় টিলার।
বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশনের পরিধি বড়ো হওয়ার পর টিলা ধ্বংসে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে প্রতিদিন রাতের আঁধারে নিধন হচ্ছে এসব টিলা।
অসাধু চক্রের কারণে নিঃশেষ হতে চলেছে পৃথিবীর খুঁটি হিসেবে পরিচিত পাহাড় আর টিলাগুলো। সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কতগুলো টিলা রয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই নগরভবনে। নানা কৌশলে অবাধে টিলা নিধনের কারণে হারিয়ে যাওয়া টিলার সংখ্যাও জানা যাচ্ছে না।
গত বছর সিলেট সিটি কর্পোরেশন ২৭টি ওয়ার্ড থেকে বর্ধিত হয়ে ৪২টি ওয়ার্ডে উন্নীত হয়। নগর বর্ধিত হওয়ার কারণে নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোর জমির দাম বেড়েছে। এ কারণে সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় টিলা কাটাও বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও সিলেটে মাঝে-মধ্যে বৃষ্টিপাত হওয়াটাকেই সুযোগ হিসেবে নিচ্ছেন টিলাখেকোরা। তারা রাতের আঁধারে টিলায় শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে রাখে। একটু বৃষ্টি হলেই পানির সঙ্গে নেমে আসে টিলার মাটি। এতে ড্রেন উপচে রাস্তার ওপরে জমে মাটির স্তূপ। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচলে যেমন বিঘ্ন ঘটে, তেমনি বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, একসময় যেখানে সুউচ্চ টিলা ছিল সেখানটায় আবাসিক ভবন কিংবা প্লট গড়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সিলেট নগরী ও আশপাশের এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি টিলাকাটা হচ্ছে নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া সিটি করপোরেশন এলাকায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে টুকের বাজারের পীর সাহেবের টিলা, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের নিতু দেবনাথ এর বাড়ির পূর্ব পাশের টিলা, আখালিয়া বড়গুলের ওসমান মিয়ার বাড়ির পূর্ব পাশের টিলা, বড়গুলের দেবোত্তর সম্পত্তিতে থাকা রাবার বাগান টিলা।
দুসকি বাজারের দক্ষিণ পূর্ব পাশের টিলা, মোহাম্মদি আবাসিক এলাকার টিলা, উপরপাড়া হেলাল সার্ভেয়ার বাড়ির পশ্চিম পাশের টিলা, নালিয়া মাদরাসা টিলা, বাটা বাবু লালের টিলা, হাওলাদার পাড়ার মজুমদার টিলা, যুগীপাড়া ফার্মের টিলা, খাদিমপাড়া ইউনিয়নের দলইপাড়া, বালুচর জোনাকী এলাকার বিভিন্ন টিলাসহ আরও অনেক স্থানে নির্বিচারে টিলাকাটা চলছে।
স্থানীয়রা জানান, টিলা খেকোরা এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রবাবশালী হওয়ায় কথা বলার সাহস নেই সাধারণ মানুষের। তারা বলেন গত ৫ আগস্টের পর পুলিশ ও প্রশাসনে যে স্থবিরতা ছিল তা এখনও বহাল আছে। এই সুযোগে অসাধুরা টিলা কেটে সাবাড় করছে।
পরিবেশ কর্মীরা বারবার আন্দোলন করেও ঠেকাতে পারছেন না টিলা ধ্বংসের কাজ। সরকারের বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করে সুফল পাচ্ছেন না- এমন অভিযোগ তাদের।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার আহমদ চৌধুরী গণমাধ্যমে বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় টিলার গুরুত্ব অপরিসীম। অসাধু লোকেরা টিলা কাটছে বিভিন্ন কৌশলে। তারা বর্ষা মৌসুমে টিলা শাবল দিয়ে খুঁড়ে রাখে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে টিলার মাটি রাস্তায় নেমে আসে। আমরা এমনও পেয়েছি, পিচ ঢালাই রাস্তা বৃষ্টির পানির সঙ্গে নেমে আসা মাটির কারণে ২-৩ ফুট নিচে নেমে গেছে। আমরা নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে এসব টিলার মাটি অপসারণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করেছি। তবে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কতটি টিলা রয়েছে, তার কোনো তালিকা নেই জানিয়ে তিনি বলেন এবার এ তালিকা করা হবে, যাতে কোনো অবস্থায় আর টিলাকাটা না হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, টিলাকাটার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। অভিযোগ পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। টিলাকাটার অভিযোগে গত এক বছরে অনেক মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, পরিবেশ রক্ষায় টিলাকাটা বন্ধ করা না গেলে প্রকৃতির বৈরীতা আরও বাড়তে পারে। কোনো অবস্থায় টিলাকাটা বরদাশত করা হবে না।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








