তিন মাসেও অধরা সাংবাদিক তুরাবের খুনিরা
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০২:৫০ PM

তিন মাসেও অধরা সাংবাদিক তুরাবের খুনিরা

অতিথি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯/১০/২০২৪ ১০:২১:২২ AM

তিন মাসেও অধরা সাংবাদিক তুরাবের খুনিরা


সিলেটে প্রকাশ্য দিবালোকেত পুলিশের গুলীতে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাব নিহতের ৩ মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে আজ। কিন্তু এখনো গ্রেফতার নেই কেউ, এমনকি নির্বিচারে গুলীবর্ষণকারী পুলিশ এখনো বহাল তবিয়তে। এ অবস্থায় পরিবারসহ সহকর্মীদের প্রশ্ন, তিন মাসেও যেখানে গ্রেফতার নেই কেউ, সেখানে বিচার হবে কবে?

জানা গেছে, বিগত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই বাদ জুমআ নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় মিছিল বের করে বিএনপি। তখন ন্যূনতম কোন উত্তেজনা ছিলনা । নিত্যদিনের মতো সেদিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকগণ। পাশেই ছিল পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এসএমপির সহকারী কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীরের মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উত্তপ্ত হয়ে উঠে কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। ঐ পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এটিএম তুরাব। পুলিশের ছোড়া ৯৮টি স্প্রিন্টারের আঘাতে নিহত হন সাংবাদিক তুরাব।

আজ ১৯ অক্টোবর তুরাব হত্যাকান্ডের ৩ মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সিলেটের সম্ভাবনাময় তরুণ সাংবাদিক তুরাব নিহতের ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্রেফতার হয়নি কোন খুনী, এমনকি তুরাব হত্যার সাথে জড়িত পুলিশের কাউকে এখনো বরখাস্ত করা হয়নি। অথচ ৫ আগস্ট পরবর্তী বর্তমানে দেশ পরিচালনা করছে ছাত্র-জনতার মনোনীত অন্তর্বর্তীকালিন সরকার। ৩ মাসেও তুরাবের কোন খুনী গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ সিলেটের নাগরিক ও সাংবাদিক সমাজ। বিক্ষুব্ধ তুরাবের পরিবার।

জানা গেছে, পুলিশের গুলিতে সাংবাদিক তুরাব নিহতের ঘটনায় গত ২৪ জুলাই পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করে। 

জিডির ব্যাপারে তৎকালিন কোতোয়ালি থানার ওসি মঈন উদ্দিন শিপন বলেছিলেন, ‘কার এবং কোন দিক থেকে আসা গুলি বিদ্ধ হয়ে তুরাব মারা গেছেন, এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে আগেই একটি মামলা করা হয়েছে। সেটির তদন্ত চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগটি আমরা রেখেছি এবং জিডি হিসেবে রেকর্ড করেছি। পরিবারের লিখিত অভিযোগ ও পুলিশের মামলাকে সমন্বয় করে তদন্ত এগোচ্ছে। এরপর থেকেই অনেকটা ধামাচাপা পড়ে যায় তুরাব হত্যা মামলা।

৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আব্দুল মোমেনের আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের ভাই আবুল হাসান মো. আজরফ (জাবুর)।

মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (ক্রাইম, উত্তর) মো. সাদেক দস্তগীর কাউছার, উপকমিশনার (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি আজবাহার আলী শেখসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মামলায় আরো ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।

এদিকে, আদালতে মামলা দায়েরের ৩ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মামলার কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি। গ্রেফতার করা হয়নি কোন আসামীকে। মামলার অন্যতম আসামী এসএমপির কোতোয়ালী থানার তৎকালিন ওসি মঈন উদ্দিন শিপনকে ২৩ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুর নিজ বাড়ী থেকে গ্রেফতার করেছিল বিজিবি। গ্রেফতারের পর মাধবপুর থানায় হস্তান্তরের পর পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। তাকে গ্রেফতারে উপরের কোন নির্দেশনা না থাকায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানান হবিগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

এদিকে চলতি অক্টোবর মাসের ১ম সপ্তাহে সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। একই সাথে পিবিআই হেড কোয়ার্টার থেকে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করতে এসএমপির কোতোয়ালী থানাকে নির্দেশ দেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে গত ৬ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআই সিলেটের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মুরসালিনকে বুঝিয়ে দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালী থানার এসআই শাওন।

এরপর ৯ অক্টোবর বুধবার বিকেলে নগরীর বন্দরবাজার সংলগ্ন শহীদ সাংবাদিক তুরাব চত্তর (কোর্ট পয়েন্ট) এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে তদন্তের কার্যক্রম শুরু করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ মুরছালিন। এসময় মামলার বাদী তুরাবের আবুল আহসান মোঃ আজরফ (জাবুর) ছাড়াও সিলেটে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তুরাবের শরীরে গুলি লাগার স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদেরকে তদন্তকাজ দ্রুত শেষ করার আশ্বাস প্রদান করেন পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা মো: মুরসালিন।

তুরাবের পরিবার ও সহকর্মীদের পক্ষ থেকে তদন্ত কর্মকর্তাকে সকল ভিডিও ফুটেজ দেয়া হয়েছে। এমনকি সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সাংবাদিকবৃন্দ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তুরাবের হাতে থাকা মোবাইল ফোন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়া হয়েছে।

হত্যাকান্ডের ৩ মাসেও আসামী গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন সাংবাদিক এটিএম তুরাবের ভাই আবুল আহসান মোঃ আজরফ (জাবুর)। তিনি বলেন, আমার ভাই হত্যার ৩ মাস সময় পার হয়েছে। মামলা এফআইআর হওয়ার পর আরো ২ মাস চলে গেছে এরপরও আসামী গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা বিস্মিত। এর মাধ্যমে পুলিশের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আমার ভাইয়ের হত্যার সাথে তো সব পুলিশ জড়িত নয়। তাহলে আসামীদের গ্রেফতার করা হচ্ছেনা কেন?

তিনি বলেন, আগে কোতোয়ালী থানার কাছে ছিল। এখন পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আমাদের কাছে যা চেয়েছেন আমরা সব দিয়েছি। এরপরও পিবিআই এর বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি দেখাতে পারেননি। এতে আমরা বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কিত।

পিবিআই সিলেটের ইন্সপেক্টর মুরসালিন বলেন, আমি তদন্তভার গ্রহণের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাক্ষ্য নিয়েছি। এব্যাপারে প্রাপ্ত সকল বিষয় জানানোর জন্য আমি ঢাকা গিয়েছিলাম। পিবিআই হেডকোয়ার্টারকে সব বিষয়ে অবগত করে এসেছি। আমার কাছে প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে গোলাম কাউসার দস্তগীর একজন পুলিশের কাছ থেকে বন্দুক নিচ্ছেন সেই দৃশ্যটা রয়েছে। কিন্তু তিনি যে সাংবাদিক তুরাবকে সরাসরি গুলী করছেন এমন ফুটেজ পাইনি। এরপরও আমি বিভিন্ন উৎস থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করছি।

তিনি বলেন, আমাদের উপর ভরসা রাখতে হবে। পুলিশ হলেই ছাড় দেয়া হবে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। কারণ রায়হান হত্যা মামলায় পিবিআই পুলিশের বিরুদ্ধে সত্য রিপোর্ট দিয়েছে। সাংবাদিক তুরাব হত্যা মামলায়ও সঠিক রিপোর্ট দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।

আসামীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে তিনি বলেন, সাধারণ আসামী এবং চাকুরীরত সরকারী কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করতে কিছু আইন রয়েছে। যার কারণে কোতোয়ালী থানার সাবেক ওসি মঈন উদ্দিন শিপনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে মামলার আসামীগণ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তারা আইন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। তাই পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে তাদেরকে গ্রেফতারের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চাওয়া হবে। এজন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর