বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে কবে?
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ০৪:৩৪

বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে কবে?

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০/০২/২০২৪ ০৯:৫৮:৩৩

বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে কবে?


কঠোর নির্দেশনা, নানাবিধ কর্ম পরিকল্পনা এবং মাঝে মধ্যে অভিযানেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তবে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ এখনো হচ্ছে না। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কড়া বার্তা দিলেও তা বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

গত সপ্তাহের সোমবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য ব্যবস্থাগ্রহণ।

তবে সেই নির্দেশনার পরও দাম কমার বদলে উল্টো বেড়েছে। এবার জনমনে প্রশ্ন উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও কেন নিত্যপণ্যের বাজারদর বাড়লো, আর বাজার মনিটরিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সেই নির্দেশনা পালনে কী ভূমিকা পালন করছেন।

যদিও বিভিন্ন জায়গায় মজুতদারি ও পণ্যমূল্য বেশি রাখার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে চাল-তেল-চিনি ও খেজুরের আমদানি শুল্কমূল্যও কমানো হয়েছে। ভারত থেকে পেঁয়াজ ও চিনি আমদানির ঘোষণাও এসেছে। তবে এসবের সুফল পেতে আরও কিছু দিন সময় লাগবে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে ভোক্তারা বলছেন, সরকার কিছু হলেই আমদানি করে। কিন্তু কম দামে তো কিনতে পারি না। তাহলে এসব আমদানির মাল কোথায় যায়। এতে আমাদের লাভটাই বা কী?

তথ্য রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনা ও দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৩টি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। তবে তাদের কার্যক্রমের সুফল এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

নিত্যপণ্যের দাম কমাতে খাদ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি চলছে অভিযান ও জরিমানাও। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো পণ্যের দাম কমতে দেখা যায়নি।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর অনলাইনে গত সোমবার দেশি পেঁয়াজের দাম দেখা গেছে ৮৫-১০০ টাকা। সরকারি সেই প্রতিষ্ঠানেই আজ শুক্রবার দেশি পেঁয়াজের দামের মূল্য তালিকায় দেখা গেছে ১০০-১২০টাকা। দেশি কাচা মরিচের দাম ছিল ৭০ থেকে ১০০ টাকা, যা বেড়ে হয়েছে ৮০-১০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি ছিল ১৮০ টাকা যা বেড়ে হয়েছে ১৮৫টাকা। এছাড়াও আরও কয়েকটি পণ্যের মূল্য টিসিবির অনলাইনে আগের চেয়ে বেশি দেখা গেছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর যুগ্ম পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, টিসিবি কোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে না। বাজারে পণ্যদ্রব্যের যে সব মূল্য চলমান থাকে সেইগুলোই প্রদর্শন করে থাকে। চলমান পণ্যের দরই টিসিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়।

রাজধানীর বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত শুক্রবার যে পেঁয়াজ ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে তা আজ ১২০ টাকা। যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল ১০০ টাকায়, সেটা আজ ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে গত সপ্তাহে যে বয়লার মুরগি ১৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তা আজ ২০০ টাকা। এছাড়া হাইব্রিড সোনালি মুরগিও ২৮৫-৯০ থেকে বেড়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।

সিম প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৬৫-৭০ টাকা। তবে বিঁচিযুক্ত সিম আগের মতোই প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। মিষ্টিকুমড়া প্রতি কেজি ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৪০ টাকা, করোলা প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁচা কলা প্রতি হালি ৩০ থেকে ৪০ টাকা।

এছাড়া গাজর প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৮০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৭০ টাকা, মুলা প্রতি কেজি ৫০ টাকা এবং পেঁয়াজের ফুল প্রতি আঁটি ২০ টাকা, ব্রুকলি প্রতি পিস ৪০ টাকা, শালগম প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে কমেনি ফার্মের মুরগির ডিমের দামও। বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা দরে। যা দুই সপ্তাহ আগে আরও ১০-১৫ টাকা কম ছিল। একইভাবে কিছুটা বাড়তি দামে ব্রয়লার মুরগি ২১০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বিক্রেতারা দাবি করছেন, বাজারে মুড়িকাটা পেঁয়াজ কম আসছে। এছাড়া বাজারে অন্য জাতের পেঁয়াজ ও ভারতীয় পেঁয়াজও নেই। তাই দাম বাড়ছে। এছাড়া পাইকারি বাজারে মুরগির সরবরাহ কমে গেছে। তাই দাম বাড়ায় এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে বলে জানিয়েছেন খুচরা মুরগি বিক্রেতারা।

কাঁচাবাজার কিনতে আসা রাশেদুল হাসান নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, হুটহাট পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কোনো কারণই খুঁজে পাই না। পেঁয়াজের সিজন চলে গেল, কিন্তু দাম কমলো না। অদ্ভুত একটা অবস্থা পার করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার কিছু হলেই আমদানি করে। কিন্তু কম দামে তো কিনতে পারি না। তাহলে এসব আমদানি মাল কোথায় যায়। এতে আমাদের লাভটাই বা কী?’

এদিকে রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই বাড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। সরেজমিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়, তবে টিসিবির তালিকায় রয়েছে ৯৫থেকে ১১০টাকা। গত সপ্তাহের তুলোনায় ছোলার দাম কেজি প্রতি বেড়েছে ৫-১০টাকা। অ্যাংকর ডাল পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, চিকন মসুর ডাল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা, চিকন মুগ ডাল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা ডাবলির ডাল ৭৫ টাকা এবং খেসারি ডাল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এসকল পণ্যে গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে ১৫-৩০ টাকা।

পুরান ঢাকার বাদামতলি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজান আসতে না আসতেই বেরতে শুরু করেছে খেজুরের দাম। আজওয়া খেজুর ৯০০-১৫০০ টাকা, মরিয়ম খেজুর ৯০০ টাকা, বরই খেজুর ৪০০ টাকা, জিহাদি খেজুর ২৪০ টাকা, মেডজুল খেজুর ১৩০০টাকা এবং দাবাস খেজুর ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের তুলনায় খেজুরের দর বেড়েছে কেজি প্রতি ২০-৫০টাকা।

এ অবস্থায় রমজান মাসে বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চাল, তেল, চিনি ও খেজুরের শুল্ক কমানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। তিনি বলেন, আমদানিকারক এবং উৎপাদকদের সঙ্গে বৈঠক করে এই শুল্কের প্রভাব যেন শিগগিরই বাজারে পণ্যের ওপর পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে জরুরি আইন প্রয়োগ করে বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

অপরদিকে শুক্রবার ঢাকার এফডিসিতে ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক ছায়া সংসদে বক্তব্যকালে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম সফিকুজ্জামান বলেন, আসন্ন রমজানের চাহিদা বিবেচনায় কয়েকটি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার। তবে ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শ্রাবস্তী রায় বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন জেলায় খাদ্যশস্যের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া ও কুষ্টিয়ায় সংশ্লিষ্ট মিলমালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইতোমধ্যে ঢাকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কেউ যদি অবৈধ পথে ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের বিষয়ে কঠোর ভূমিকা পালন করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। তবে আমাদের দেশে এখনও মূল্যস্ফীতি কমেনি। এর প্রভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি পণ্যের দামে লাগাম টানতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেগুলো ঠিকমতো নেওয়া হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, বাজার সংশ্লিষ্ট সব সেক্টরেই এখন হযবরল অবস্থা। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাজার সংশ্লিষ্ট সব সেক্টরকে ঠিক করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বাজার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। নিত্যপণ্যের চলমান ঊর্ধ্বগতিতে ভোক্তারা অস্বস্তিতে রয়েছেন। নিম্ন আয়ের মানুষেরা খুবই কষ্টে আছেন। দেশের পুরো বাজার ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজিয়ে পণ্যমূল্য সহনীয় করতে হবে। তাহলে ভোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে।

আজকের সিলেট/ডিটি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর