জুলাই জাতীয় সনদের একটি ‘সমন্বিত খসড়া’ প্রস্তুত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদ নিয়ে বিএনপির সাথে বিপরীত অবস্থান জামায়াতের। জামায়াত ছাড়াও এনসিপি স্পষ্ট করে বলেছে, জুলাই সনদে কোন ছাড় দেয়া হবে না।
সনদের খসড়ায় বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচিত সরকার দুই বছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে। যা নিয়ে একমত বিএনপি। তবে জামায়াত-এনসিপি সহ কিছু দলের দাবি, আগামী সংসদের ভরসায় না রেখে জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে হবে এখনই।
এমন বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞদের মত চেয়েছে ঐক্যমত্য কমিশন। গণভোট কিংবা সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে ঐকমত্য কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ প্যানেল। কমিশন চাইছে দু-একদিনের মধ্যেই বিষয়টি সুরাহা করে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা দেয়ার।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেন, আমরা আশা করছি আগামী দু-একদিনের মধ্যে তাদের মতামত পাওয়া যাবে এবং তার ভিত্তিতে একটা ধারনাপত্র তৈরি করা যাবে যে বিশেষজ্ঞরা কী বলছে। সেটা হলে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করবো পাশাপাশি আমরা সরকারের সঙ্গেও কথা বলবো।
বিষয়টি নিয়ে ঐক্যমত্য কমিশন যেসব বিশেষজ্ঞের সাঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের একজন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। জানালেন, গণভোট কিংবা সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে সনদ কার্যকরের ভাবনাও রয়েছে কমিশনের।
ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, জনগণ সর্বময় ক্ষমতার মালিক। কাজেই জনগণ গণভোট করে সংবিধানের পরিবর্তনও করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার যেটা জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে এসেছে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার ক্ষমতা কিন্তু জুলাই ডিক্লেয়ারেশনে দেয়া হয়েছে। সে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে একটা বিশেষ সাংবিধানিক আইন বা বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জাতীয় কিছু হতে পারে।
বিদ্যমান বাস্তবতায় পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেক চ্যালেঞ্জিং মনে করছেন এই আইনজীবী। বলছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না হলে, আশঙ্কা থাকবে ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জে পড়ার।
ড. শরীফ ভূঁইয়া আরও বলেন, আমরা যদি অন্যভাবে এ আইনের ভিত্তি করি অবশ্যই এটা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হতে পারে অথবা পরবর্তী পার্লামেন্ট এসে বলতে পারে যে আমরা এটা বাতিল করলাম। সে ক্ষেত্রে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো যারা অংশিজন আছে তাদেরকে ওউন করার বিষয়টা।
সংস্কার প্রস্তাবনার কিছু মৌলিক বিষয়ে এখনো ভিন্নমত রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। এটি পরিবর্তনের প্রত্যাশা অধ্যাপক আলী রীয়াজের।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, আমরা বিষয়টাকে তুলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করলাম যে এগুলো আপনাদের বদলাতে হবে। আমাদের যে লক্ষ্য ছিলো সে লক্ষের যতটুকু সম্ভব অর্জন করেছি, সুপারিশ করেছি। বাকিটা রাজনীতিবিদদের, তাদেরকে কিন্তু করতেই হবে।
তিনি বলছেন, সংস্কার বাস্তবায়ন করে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক চর্চার পথ সুগম করার মূল দায়িত্ব নিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই।
গত বধুবার আইনি ভিত্তি দিয়ে জুলাই সনদের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে রাজধানীতে মিছিল-সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, আগে জুলাই সনদ, পরে নির্বাচন হবে।
ওদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে ৫ আগস্ট অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন, তা নিয়ে মনঃক্ষুন্ন হলেও কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায়নি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে তারা দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির ব্যাপারে এনসিপি ছাড় দিতে রাজি নয়।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির বিষয়টি সুরাহা হওয়ার পর আমরা নির্বাচন নিয়ে ভাবব।
রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এগুলো একেক দলের রাজনৈতিক অবস্থান। প্রতিটি দলই নির্বাচনী দৌড়ে আছে। এ জন্য তারা পরস্পরকে চাপে রাখবে, এমনকি সরকারকেও চাপে রাখবে, এটা স্বাভাবিক।
কি আছে সদনের খসড়ায়
সদনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। এই সনদের কোনো শব্দ, বাক্য ও নীতিমালা সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এই সনদের প্রাধান্য থাকবে।
এই সনদের যেসব সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, দেরি না করে সেগুলো পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবে সরকার।
সনদের সমন্বিত খসড়ার সঙ্গে আট থেকে দশ দফার একটি অঙ্গীকারনামা থাকবে, যেখানে এই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেবে রাজনৈতিক দলগুলো। সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ঐকমত্য কমিশন সংশ্লিষ্টরা সনদে সই করবেন।
‘সমন্বিত খসড়া’র আইনি দিকগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে শুক্রবার রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে তা পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এদিকে, প্রাথমিক খসড়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন করে এই ‘সমন্বিত খসড়া’ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দুই পর্বের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামতের প্রতিফলন রাখা হয়েছে।
এখন খুঁটিনাটি বিষয় পুনর্নিরীক্ষা করা হচ্ছে জানিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ বলেছেন, এটি চূড়ান্ত করে তারা দলগুলোর কাছে এটি পাঠাতে চান।
ঐকমত্য কমিশন বলছে, প্রথম পর্বের সংলাপে ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্যে ৬২টি বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের সংলাপে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি সাংবিধানিক বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ১১টি বিষয়ে সবদলের সমর্থনে জাতীয় ঐকমত্য এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া বাকি ৯টি বিষয়ে অধিকাংশ দলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মধ্যে ২৯ জুলাই ‘জুলাই জাতীয় সনদের প্রাথমিক খসড়া’ পাঠানো হয়। তখনই জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এই সনদ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আইনি সুরক্ষার দাবি জানায়, যা ‘সমন্বিত খসড়া’য় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ কী হবে তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশন তাকিয়ে রয়েছে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে।
এ সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা এবং সংস্কার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণের লক্ষ্যে গত ১০ অগাস্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এক দফা আলোচনা হয়েছে। এখন অঙ্গীকারনামাসহ এই ‘সমন্বিত খসড়া’ নিয়ে কমিশন সরকারের সঙ্গে আলোচনার করবে বৃহস্পতিবার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অঙ্গীকারনামার প্রস্তাবিত দফাগুলো নিয়ে আইনজীবীদের মতামতও নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর এসব আইনি দিক চূড়ান্ত হবে।
অর্থাৎ, সমন্বিত খসড়া সনদের অঙ্গীকারনামায় যেসব বিষয় এসেছে, সেখানে আইনি দিকগুলোতে আরো পরিবর্তন আসতে পারে।
অঙ্গীকার নামা (সমন্বিত খসড়া)
১) গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্তদান এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগ-তিতীক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তৎপ্রেক্ষিতে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব।
২) ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ জনগণের সর্বজনীন অভিপ্রায়ের সুস্পষ্ট ও সর্বোচ্চ অভিব্যক্তির পরিপ্রেক্ষিতে প্রণয়ন করা হয়েছে বিধায় এই সনদের সকল বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একটা ব্যবস্থা (আইনি দিক আলোচনা চলছে) করা হবে।
৩) এই সনদের ব্যাখ্যার এখতিয়ার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের উপর ন্যস্ত থাকবে।
৪) জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-কে সম্পূর্ণ আইনগত বলবৎ হিসেবে গণ্য করা হবে।
৫) ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ দেশের শাসন ব্যবস্থা তথা সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার বিষয়ে যেসব প্রস্তাব/সুপারিশ এই সনদে লিপিবদ্ধ রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, লিখন ও পুনর্লিখন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, লিখন, পুনর্লিখন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন করব।
৬) ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করব। এই সনদের কোনো শব্দ, বাক্য ও নীতিমালা সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এই সনদের প্রাধান্য থাকবে।
৭) গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকব।
৮) ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করব।
৯) এই সনদের যে সমস্ত সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য বলে বিবেচিত হবে সেগুলো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করেই সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই বাস্তবায়নের যথাযত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংযোজন-পরিমার্জনের পর আইনি দিক পর্যালোচনা করে অঙ্গীকারনামায় দফার সংখ্যা কমানো বাড়ানো হতে পারে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








