বয়স প্রায় ৭৪। সম্প্রতি অসুস্থও ছিলেন, কিন্তু মনোবল কমেনি একটুও, তিনি দিরাই—শাল্লার সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। বৃহস্পতিবার বিকালে দিরাই পৌর এলাকায় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে হাত নেড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের শুভেচ্ছা জানানোর সময় দাঁড়িয়ে প্রতিধ্বনি জানিয়েছেন পথের পাশে দাঁড়ানো দলমত নির্বিশেষে সকলেই। প্রবীণ এই রাজনীতিক গেল ১৯ নভেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। এর আগে গেল মঙ্গলবার দিরাই ফিরলে হাজারো মানুষ তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। বড় আকারের সমাবেশে বক্তব্যও দেন তিনি। এরপর থেকে আছেন দিরাই ডাক বাংলোয়। ওখানেই সার্বক্ষণিক কর্মীরা ঘিরে রাখছে তাঁকে। গ্রামের বাড়ি দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ গ্রামে। দিরাই পৌর এলাকার আনোয়াপুরে বাড়ি রয়েছে তাঁর। সৎ ভাইদের সঙ্গে মান—অভিমান আছে, এ কারণে ওখানে কিছুদিন হয় যান না তিনি।
দিরাই বিএনপির একজন কর্মী বললেন, ডাকবাংলোয় থাকলে কী হবে, একবারও হোটেল রেস্তোরাঁয় খেতে হয় নি এই প্রবীণ রাজনীতিককে। কে আগে তাকে খাবার দেবে, এ নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা আছে।
দিরাই বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবীর বললেন,‘তাঁকে (নাছির উদ্দিন চৌধুরী) ঘিরে কর্মীদের ভালোবাসার শেষ নেই, কে কোনদিন খাবার খাওয়াবে রীতিমত রুটিন করে জানাতে হচ্ছে।’বিএনপির দিরাই পৌর শহরের চণ্ডিপুর এলাকার কর্মী আজাদ মিয়া বললেন, ‘তিনদিন ধইরা (ধরে) ঘুরেরাম, লিডাররে খাওয়াইতাম চায়রাম, চান্স পায়রাম না। ঘুরতে ঘুরতে লিডারে কইছইন (বলেছেন) রবিবার বা সোমবারে খাইবা। দেখি খাওয়ানি যায় কী—না।’
দিরাই পৌর এলাকার আনোয়ারপুরেও বাড়ি রয়েছে সাবেক এই সংসদ সদস্যের। ওখানে তার সৎ ভাইয়েরা থাকেন। তিনি ডাক বাংলোয় ওঠেছেন সপ্তাহ্ খানেক আগে। ওখানে কর্মীরাই প্রতিদিন তাঁকে নিজেদের বাড়ির রান্না করা খাবার এনে খাওয়াচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়িতে নিয়ে দাওয়াত করে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। দলীয় কর্মী আজাদ মিয়া বললেন, বৃহস্পতিবার তিনিসহ চার জন তাঁকে (নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে) দাওয়াত খাওয়ানোর জন্য এসেছেন। এরা হলেন— দৌজ’এর আবুল কালাম, ইসলামপুরের লক্কু মিয়া ও পূর্ব দিরাইয়ের ফজলুর রহমান। পরে তাঁর সমর্থক নেতারা সিদ্ধান্ত দেন, বৃহস্পতিবার পূর্ব দিরাইয়ের ফজলুর রহমান খাওয়াবেন। শুক্রবার দৌজ’এর আবুল কালাম এরপর তাঁর (আজাদ মিয়ার) পালা।
৫০ বছরেরও বেশি সময় হয় সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে ঘিরেই দিরাই—শাল্লার বেশিরভাগ বিএনপি কর্মীরা স্বপ্ন দেখেন। প্রচলিত ধারার বিপরীতধর্মী রাজনীতিক তিনি। রাজনীতিকে কখনোই ব্যবসা মনে করেন নি। দুইবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং একবার এমপি ছিলেন এই দলীয় নেতা। ২০১৫ ইংরেজি থেকে ২০১৭ ইংরেজি পর্যন্ত জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। তাকে ঘিরে কখনোই কোন লুটের বা ব্যবসায়ী সিণ্ডিকেট তৈরি হয় নি। এই সততা নির্মোহতাকে সম্মান দেখানোর জন্যই দলীয় নেতা—কর্মীরা তাঁর চিকিৎসার জন্য খরচের টাকারও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছেন। তাঁর সভা—সমাবেশ, খাবার দাবারের সকল চিন্তাই যেন কর্মীদের মাথায়।
নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রশ্ন ছিল—কত বছর হলো সক্রিয় রাজনীতিতে। বললেন, ‘৫০’ বছরের এর বেশি হয়েছে।’ প্রথম দিকে আপনার নেতা যারা ছিলেন, তাদের কথা নিশ্চয়—ই মনে পড়ে, বললেন—পড়বে না কেনো, ‘ন্যাপের গোলজার ভাই—রব্বানী ভাই, এরা এখন জীবিত নাই। আমি আছি, যতদিন বাঁচমু (বেঁচে থাকবো), মাইনসের লগেই থাকমু’।প্রশ্ন ছিল নির্বাচন করতে এখন প্রচুর টাকা লাগে, আপনার কী এতো টাকা আছে। উত্তরে বললেন,‘আমার টেকা লাগতোনায়, মাইনসে দিব।’
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী সুনামগঞ্জ—২ (দিরাই—শাল্লা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী। গত মঙ্গলবার দিরাই উপজেলা ও পৌর বিএনপির আয়োজনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো গঠনে ৩১ দফা বাস্তবায়ন উপলক্ষে জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘ এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ নির্বাচন, আমি হয়তো আর নির্বাচন পাবো না। আমার একটি স্বপ্ন ছিল দিরাই—শাল্লার মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর। কিন্তু আমি তা পারিনি, এমনকি এখান থেকে নির্বাচিত বার বার সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তেমন কিছু করতে পারেন নি। আগামীতে আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে গিয়ে নির্বাচনী এলাকার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই।’
নাছির উদ্দিন চৌধুরীর পিতার নাম মৃত. মো. গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী এবং মাতার নাম মৃত. আফতারুন নেছা খানম। ১৯৬৬ সালে নাছির উদ্দিন চৌধুরী সিলেট এমসি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি, ১৯৬৮ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস এবং ১৯৭০ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক ছিলেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৯ সালে দুইবার দিরাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।
এছাড়াও ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির হয়ে প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ৫০৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন তিনি। নাছির উদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৫৯ হাজার ভোট এবং প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পান ৫৮ হাজার ৪৯৬ ভোট।
এরপর ২০০১ সালে প্রথম ও ২০০৮ সালে দ্বিতীয় এবং ২০১৮ সালে তৃতীয়বারের মতো বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী। প্রথম দুইবার অর্থাৎ ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে পরাজিত হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জ—২ (দিরাই—শাল্লা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন তিনজন। এরা হলেন—নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সাবেক বিচাপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমি ও জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা অ্যাড. তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেল।গেল তিন নভেম্বর দেশের ২৩৭ টি নির্বাচনী আসনে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেন। এই আসনে ওইদিন প্রার্থী ঘোষণা করা হয় নি। নাছির উদ্দিন চৌধুরী অসুস্থ অবস্থায় এদিনও সিঙ্গাপুরে চিবিৎসারত ছিলেন।
আজকের সিলেট/এপি/প্রতিনিধি
সংবাদদাতা 








