রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বাস করেন আজমেরি ইসলাম ও তার পরিবার। গত বছর অক্টোবরে হঠাৎ জ্বর হলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে তার। সেরে উঠতে না উঠতেই ডিসেম্বরে আবারও ডেঙ্গু আক্রান্ত হন তিনি। শুধু তিনিই নন, তার পরিবারের মা ও তার ৩ বছরের সন্তানও ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
“জ্বরের শুরুতে ভাবিনি ডেঙ্গু হবে। কিন্তু তিন দিনের জ্বরে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। সে কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। পরীক্ষার পর জানতে পারি আমি ডেঙ্গু আক্রান্ত,” বলেন আজমেরি ইসলাম।
তার বক্তব্য থেকে জানা যায়, তার বাড়ির পাশের পুরোনো নির্মাণ সাইটে বর্ষার পানি জমে থাকায় এডিস মশা জন্মানোর আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সে কারণেই তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছেন। এলাকার অন্যান্য পরিবারেও কেউ না কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিভন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে পানি জমে থাকায় এডিস মশার বংশ বাড়ছে।শহুরে জীবনযাপন ও মাঠ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনার অভাবে এ রোগের বিস্তার বাড়ছে। তবে ডেঙ্গু এখন শুধু শহরের রোগ নয়, উপশহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসা সাতক্ষীরা জেলার কৃষক নূর আলম জানান, তাদের গ্রামে মানুষ এ জ্বরকে স্বাভাবিক হিসেবেই মনে করেছিল। শহুরে ডেঙ্গু তাদের গ্রামেও হানা দেবে, এটা তারা ভাবেননি।
তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানির নর্দমায় এডিস মশা নির্বিঘ্নে জন্ম নিতে পারে। গ্রামের মানুষরা ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতন না থাকায় গত বছর সেখানে বহু পরিবার আক্রান্ত হয়েছে।
ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেসের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট এক লাখ দুই হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৪১২ জন। রোগটি ৬৩টি জেলায় শনাক্ত হয়েছে, অর্থাৎ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই এডিস মশার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে।
ঢাকার বাইরে বরগুনা, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ দেখা দিয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
মৃত্যুর প্রবণতা
গত বছর অক্টোবর মাসটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এক মাসেই অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। এছাড়া সারা বছরই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। এ সংখ্যাই বলে দেয়, ডেঙ্গু আর মৌসুমী রোগ নয়, এটা নাগরিকদের স্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেঙ্গু বাড়ার নেপথ্য আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন
বিভিন্ন গবেষণা ও বৈশ্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উষ্ণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হওয়া- সব মিলিয়ে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। আবহাওয়া পরিবর্তন ডেঙ্গুর প্রকোপ ও সময়সীমা পরিবর্তন করছে, ফলে রোগের মৌসুম এখন বর্ষার আগেই শুরু হচ্ছে এবং তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএনএএস)- এ প্রকাশিত গবেষণা বলছে , যেসব দেশে ডেঙ্গু ভাইরাস নিয়মিতভাবে ছড়ায়, সেসব দেশের স্থানীয় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে রিপোর্ট হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর গড় প্রায় ১৮ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল তাপমাত্রা বৃদ্ধি। গবেষণাটি দাবি করছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উষ্ণায়নের কারণে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে ইতোমধ্যেই বিপুল মানবিক দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের Environmental & Occupational Health Sciences বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মারিসা চাইল্ডস-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এতে স্ট্যানফোর্ড, হার্ভার্ড, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চের গবেষকরাও অংশ নিয়েছেন। গবেষণায় বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণের ১.৪ মিলিয়ন ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, এবং দেখা গেছে উচ্চ তাপমাত্রা ও গ্লোবাল উষ্ণায়ন প্রতি বছর লাখ লাখ অতিরিক্ত সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) জার্নালে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে সংক্রমণ আরও ৭৬% পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে।
নগরায়ন ও জনঘনত্ব
“ক্লাইমেট মাইগ্রেশনের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালের মতো শহরে দ্রুত নগরায়ন ও জনঘনত্ব বাড়ায় ডেঙ্গুর সময় ও বিস্তার বেড়েছে। অপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে এডিস মশা সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে পারছে,” বলে বাংলানিউজকে জানান পরিবেশবিদ ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার।
বছরজুড়ে ডেঙ্গু ঝুঁকি
ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। এটি বছরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম থেকে শরৎকালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, “বাংলাদেশের তাপমাত্রা এডিস মশার জন্য উপযোগী। অর্থাৎ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসই এডিস মশার প্রজননের জন্য যথেষ্ট। তবে এর সাথে অপরিকল্পিত নগরায়ন, শহরের বাসা বাড়িতে জমা পানি ও বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দায়ী। তবে শীতকালে এডিস মশার প্রজনন তুলনামূলক কম। কেননা এ সময় বৃষ্টি হয় না বলে পানি জমে না। বাসা বাড়ির ছাদ, টবসহ বিভিন্ন স্থানে জমা পানির কারণে এ মশার প্রজনন অব্যাহত থাকে।”
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আজকের সিলেট ডেস্ক 








