হবিগঞ্জে হিসেব নিকেশে প্রভাব ফেলবে নতুন ভোটার ও বিদ্রোহীরা
সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:০৩ AM

হবিগঞ্জে হিসেব নিকেশে প্রভাব ফেলবে নতুন ভোটার ও বিদ্রোহীরা

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৮/০২/২০২৬ ০৫:২৭:৪২ PM

হবিগঞ্জে হিসেব নিকেশে প্রভাব ফেলবে নতুন ভোটার ও বিদ্রোহীরা


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আর মাত্র ৪ দিন বাকি। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নানান সমীকরণে সরগরম হয়ে উঠছে হবিগঞ্জ জেলার চারটি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি। এই জেলার চারটি আসনেই রয়েছে ভিআইপি প্রার্থীদের অংশগ্রহণ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জিকে গৌছ ও ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন এখানে আলাদা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরবাইরে আমীরে মজলিস মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ (বড় হুজুর) এবং দলের মহাসচিব অধ্যাপক ড. আহমদ আবদুল কাদের।

ভিআইপি জেলায় ভোটাররাও ভিআইপি চিন্তায় এগুচ্ছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এবারই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যাদের বেশিরভাগের মধ্যে জুলাই চেতনা বিরাজমান। এরবাইরে জেলায় অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় বিএনপি প্রার্থীদের পাল্লা ভারী থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা এতে প্রভাব ফেলেবেন নিশ্চিত।

প্রার্থী ও আসনভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণেও এবার রয়েছে নানা মাত্রা। জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত চারটি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে দুজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলীয় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হবিগঞ্জ-১
নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের সিলেট মহানগর সেক্রেটারী মু. শাহজাহান আলী জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে যাওয়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এখন চলে এসেছেন বিএনপি প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া। এরআগ পর্যন্ত মূল আলোচনায় ছিলেন শাহজাহান আলী। অল্পদিনে তিনি পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে ভোটারদের এতো কাছে চলে গিয়েছিলেন যে অনেকে কাছেই ছিল তা অবিশ্বাস্য।

বিএনপি প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার বাবা আওয়ামীলীগের সাবেক মন্ত্রী মরহুম শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ইমেজে আওয়ামী ঘরনার ভোট ব্যাংক এবং সুজাত মিয়া বিএনপির দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সৈনিক ও সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় দুজনেরই নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। তাদের এই দলীয় বিভক্তি ফলাফলে বড়ো প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এর বাইরে এ আসনে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মিরপুরীও ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এলাকায় তার রাজনৈতিক পরিচিতি ব্যাপক না থাকলেও ইসলামী বক্তা হিসেবে তিনি অনেক সমাদৃত, তাছাড়া জোটের নেতাকর্মীরাও জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন।

হবিগঞ্জ-২
বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবনের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ (বড় হুজুর)।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সাংবাদিক আফসার আহমেদ রূপক, জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী ও বাসদ মনোনীত প্রার্থী লুকমান আহমেদ তালুকদার।

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও সাধারণ ভোটারদের মতামত বিশ্লেষণে হবিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে। তবে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব এবং নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আমীরে মজলিস মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ (বড় হুজুর) দলের শীর্ষ নেতা হওয়ায় অনেকে সেইদিকও বিবেচনায় নিয়েছেন। পাশাপাশি শেষদিকে এসে জামায়াতে ইসলামীসহ এগারো দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাও প্রচারণায় অনেক বেশি সক্রিয় হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে তার ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রার্থী সমীকরণ ও নতুন ভোটারদের উপস্থিতিতে হবিগঞ্জ-২ আসনের নির্বাচনী মাঠ শেষ মুহূর্তে এসে জমে উঠেছে।

হবিগঞ্জ-৩
হবিগঞ্জ সদর-লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামের কাজী মহসিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলনের মহিব উদ্দিন আহমেদ সোহেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে রয়েছেন। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও নতুন করে গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট আশরাফুল বারী নোমানের জামায়াতে যোগদান ভোটের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে সাবেক বিএনপি নেতা হিসেবে নোমানের এলাকায় ব্যাপক পরিচিতির বাইরেও কোনো কোনো এলাকায় তার সীমাহীন প্রভাব রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী ঘরনার ভোটারদের কাছেও নোমান সমাদৃত। ফলে শেষদিকে এসে তার এই যোগদান এবং নেতাকর্মীদের নিরলস প্রচারণা জিকে গৌছের মাঠ অনেক কঠিন করে দিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দলে জিকে গৌছের ব্যক্তিগত ইমেজ সংকট এবং আশরাফুল বারী নোমানের দুর্দান্ত প্রতাপ জামায়াত জোট প্রার্থী কাজী মহসিনকে অনেকটাই প্রতিযোগিতার দৌড়ে গতিতে নিয়ে এসেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

হবিগঞ্জ-৪
চুনারুঘাট-মাধবপুর আসনে রয়েছে ২৪টি চা বাগান। ঐতিহাসিকভাবে চা শ্রমিকদের ভোটই এখানে জয়-পরাজয়ের মূল নিয়ামক। এবারের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী এস এম ফয়সল, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হচ্ছে। তবে শেষদিকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির ফয়সল এবং খেলাফত মজলিসের আহমদ আবদুল কাদের মধ্যেই হবে বলে মনে করছেন অনেকে। শিল্পপতি এবং ব্যক্তি ও পারিবারিক ইমেজের কারণে ফয়সলের রয়েছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। সেই সূত্রে চা বাগানগুলোতেরও তাদের পরিচিত ব্যাপক। অপরদিকে খেলাফত মজলিসের আহমদ আবদুল কাদের কেন্দ্রীয় নেতা ও শিক্ষাবিদ হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের কাছে তারও রয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। ইসলামী বক্তা গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর প্রচারণা আবাল বৃদ্ধ বনিতারা বিনোদন নিলেও পতিত আওয়ামী সরকারের এমপি ব্যারিস্টার সুমনের সাথে তার সখ্যতার কারণে ভোটের মাঠে তার দিকে ভোটারের ঝোঁক কম।

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও সাধারণ ভোটারদের মতামত বিশ্লেষণে চারটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব এবং নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে চারটি আসনেই বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল পালাক্রমে জয়লাভ করেছে। অতীত ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ঘিরে জেলার চারটি আসনেই কৌতূহল তুঙ্গে।

সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রার্থী সমীকরণ, বিদ্রোহী প্রভাব ও নতুন ভোটারদের উপস্থিতিতে হবিগঞ্জের নির্বাচনী মাঠ শেষ মুহূর্তে এসে জমে উঠেছে। প্রার্থীদের শেষ মুহূর্তের গণসংযোগ, প্রচারণা ও ভোটের হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে প্রশাসনের দুশ্চিন্তা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেলার মোট ৬শ ৪৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১শ ৩টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২শ ৩২টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব কেন্দ্রকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলার চারটি সংসদীয় আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯শ ৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ২৮ হাজার ৬শ ৯৬ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৫ হাজার ২শ ৪২ জন এবং হিজড়া ভোটার ২৪ জন। এবারের নির্বাচনে নতুন করে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ২১৭ জন, যা ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিষয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন জানান, পূর্ববর্তী নির্বাচনে সহিংসতার ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াত সমস্যা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কোন কোন কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ, তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, এসব কেন্দ্রে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এবার প্রথমবারের মতো প্রিসাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা এবং পুলিশের বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে হবিগঞ্জ জেলায় নিয়োজিত থাকবেন ২ হাজার ৪৭ জন পুলিশ সদস্য, দুটি কুইক রেসপন্স টিম, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা। ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি আসনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা নির্বাচন অফিস।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর