৫ আগস্ট: যে দিনে ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখেছিল
বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৪ AM

৫ আগস্ট: যে দিনে ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখেছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫/০৮/২০২৬ ১২:৫৩:৫১ PM

৫ আগস্ট: যে দিনে ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখেছিল


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ক্যালেন্ডারের আর দশটি দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সোমবারের সেই সকাল। কিন্তু দিনের বুকের ভেতর যে লুকিয়ে ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়, তা তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কে মোড়া সকালটি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পালাবদলের দিনে।

ছাত্র-জনতার উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের মুখে টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। কয়েক ঘণ্টার সেই নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ আজও মানুষের স্মৃতিতে এক জীবন্ত ইতিহাস, এক অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চের দৃশ্য হয়ে আছে।

এই পরিবর্তনের বীজ রোপিত হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগেই। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে। আন্দোলন দমনে কঠোর শক্তি প্রয়োগ, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতার ভিত্তিই কেঁপে ওঠে।

জুলাইয়ের শুরুতে রাজপথে নেমেছিল স্বপ্নবাজ তরুণেরা। তাদের কণ্ঠে ছিল সংস্কারের দাবি, চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের মিছিলে গুলির শব্দ মিশে গেলে বদলে যেতে থাকে সবকিছু। রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি, অন্যদিকে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর—দেশজুড়ে তৈরি হয় এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি।

কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ব্যারিকেড—সবই যেন ক্রমশ পরিণত হয় ক্ষুব্ধ জনস্রোতের সামনে অসহায় প্রতীকে। ভয়কে অতিক্রম করে মানুষ তখন নেমে আসে রাজপথে। আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে।

৫ আগস্টের লং মার্চ টু ঢাকা ছিল সেই দাবির চূড়ান্ত প্রকাশ। আগের রাত থেকেই রাজধানীকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে। রাজধানীর প্রবেশপথে সাঁজোয়া যান, ব্যারিকেড আর কারফিউ—সবই ছিল মানুষের অগ্রযাত্রা থামানোর শেষ চেষ্টা। কিন্তু ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই সেই সব প্রতিরোধ যেন জনস্রোতের সামনে বালুর বাঁধ হয়ে ভেঙে পড়ে।

উত্তরা, গাজীপুর, সাভার, যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড—সব পথ যেন এক হয়ে ছুটে যায় ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের দিকে। শাহবাগ, জসিমউদ্দীন, রামপুরা, যাত্রাবাড়ী—প্রতিটি মোড়ে মানুষের ঢল মিলিত হতে হতে সৃষ্টি হয় এক উত্তাল মানবসমুদ্র। সেই সমুদ্রের গন্তব্য ছিল একটা গণভবন।

এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। গণভবনের বাইরে তখন হাজারো মানুষের গর্জন, ভেতরে অনিশ্চয়তা আর দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপ।

দুপুর আড়াইটার দিকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে গণভবন থেকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলা বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সি-১৩০জে পরিবহন বিমানে চড়ে তিনি ভারতের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেন। দীর্ঘ দেড় দশকের এক শাসন অধ্যায়ের পর্দা নেমে আসে সেদিন।

একই সময়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। জানানো হয়, শিগগিরই জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এরই মধ্যে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সেনাপ্রধান।

টেলিভিশনের পর্দায় শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রচারিত হতেই মানুষের ঢল নেমে আসে গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনের চত্বরে। রাজকীয় বাগান, ফোয়ারা আর প্রশস্ত প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয় মানুষের উচ্ছ্বাস, বিস্ময় ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী এক বিশাল জনসমুদ্রে।

ঢাকার এই নাটকীয় পরিবর্তনের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় সিলেটেও। সকাল থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। চৌহাট্টা, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, কোর্ট পয়েন্ট ও বন্দরবাজারজুড়ে ছিল টানটান উত্তেজনা। চৌহাট্টা শহীদ মিনার এলাকায় সশস্ত্র অবস্থানে ছিলেন সোয়াট সদস্যরাও।

কিন্তু দুপুর গড়াতেই দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধীরে ধীরে অবস্থান গুটিয়ে নেন। ব্যারাকে ফিরে যান পুলিশ সদস্যরা। আর তখনই রাজপথে নেমে আসে হাজারো মানুষ।

বিকেলের আলো ফুরানোর আগেই চৌহাট্টা, কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার ভরে ওঠে বিজয় মিছিলে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে শামিল হন সেই জনস্রোতে। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নগরীর প্রধান সড়কগুলো। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসানের প্রত্যাশা, নতুন সময়ের স্বপ্ন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ সেদিন ইতিহাসকে দেখেছিল খুব কাছ থেকে।

৫ আগস্ট তাই কেবল একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো দিন। যে দিনে রাজপথের জনস্রোত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল, আর ইতিহাস লিখেছিল নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর