৫০ কোটি টাকার বিসিক এস্টেট এখন জঙ্গল!
রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০২ PM

৫০ কোটি টাকার বিসিক এস্টেট এখন জঙ্গল!

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৯/০৮/২০২৬ ১২:৩৫:৫৭ PM

৫০ কোটি টাকার বিসিক এস্টেট এখন জঙ্গল!


সুযোগ-সুবিধা রয়েছে যথেষ্ট। তবে তীব্র সংকট উদ্যোক্তার। শুধু উদ্যোক্তার অভাবে সাত বছরেও আলোর মুখ দেখেনি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গড়ে ওঠা বিসিক এস্টেট। বিসিক এলাকা এখন ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য পাকা রাস্তা, প্রশাসনিক ভবন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ—সবকিছু স্থাপন করা হলেও এগুলো এখন চুরি হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ট্রান্সফরমার চুরি ও গ্যাসের পাইপ কাটা পড়ার ঘটনাও বেড়েছে। ঝোপ-জঙ্গলে ভরে থাকায় এখানে একা হাঁটাকে ‌নিরাপদ মনে করেন না অনেকেই। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, দাম বেশি হওয়ায় প্লট বিক্রি হচ্ছে না।

শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর সংশ্লিষ্ট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য ২০ একর জায়গা জুড়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয় ২০১২ সালে। ২০১৬ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের মধ্যে এর অবকাঠামো, প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক কোয়ার্টার, পাম্প হাউজ, গ্যাস সাবস্টেশন, পুকুর এবং পাকা অভ্যন্তরীণ রাস্তা প্রস্তুত হয়ে যায়।

এস্টেটটি তিনটি ক্যাটাগরিতে ১২২টি প্লটের জন্য ডিজাইন করা হয়। এ, বি এবং এস—এই তিন ভাগে ভাগ করে ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। আর প্রতিটি প্লটের ইজারার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ৯৯ বছর। প্রতি শতকের দাম নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ ৪৮ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় উদ্যোক্তা কম থাকায় কমসংখ্যক প্লট বিক্রি হয়েছে, এস্টেটটি তিনটি ক্যাটাগরিতে ১২২টি প্লটের জন্য ডিজাইন করা হয়। এ, বি এবং এস—এই তিন ভাগে ভাগ করে ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। আর প্রতিটি প্লটের ইজারার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ৯৯ বছর। প্রতি শতকের দাম নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ ৪৮ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় উদ্যোক্তা কম থাকায় কমসংখ্যক প্লট বিক্রি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষের দিকে ১২২টি প্লটের মধ্যে ৫৬টি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে বরাদ্দ দেওয়া হয় আরও ছয়টি প্লট। যারা প্লট নিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই জেলার বাইরের উদ্যোক্তারা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন টাকা ফেরত চাচ্ছেন। আবার অনেকেই শিগগির কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন।

কোম্পানিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এর কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা এখানে বিনিয়োগ করার পরও বিভিন্ন বাধায় আটকা পড়েছি। এখান থেকে যেতেও পারছি না, আবার পুরোপুরিভাবে কার্যক্রমও শুরু করতে পারছি না। আমরা সীমিত পরিসরে কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। তাদের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে-কলমে উদ্যোক্তা।

স্থানীয় ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে প্লটের দাম আশপাশের বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ কারণে এখানে প্লট নিতে আগ্রহ কম। ফলে শেষ হওয়ার পর সাত বছর পরও এস্টেটটি সম্পূর্ণ অবহেলা অবস্থায় পড়ে আছে। ১২২টি প্লটের এই শিল্প এলাকায় চালু হয়েছে মাত্র একটি কারখানা।

সরেজমিন দেখা যায়, শিল্পনগরীর ১২২টি প্লটের বেশিরভাগই এখন ঝোপঝাড়ে ঢাকা। পিচঢালা সড়কের দুই পাশ দিয়ে গজিয়ে উঠেছে ঘাস, লতাপাতা ও ছোট-বড় গাছপালা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রবেশগেটটি প্রায় গাছপালায় ঢেকে গেছে। বোঝার উপায় নেই সেখানে কোনো প্রবেশপথ ছিল। গ্যাস সাবস্টেশনের সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকা এখন বিদ্যুৎবিহীন। ভবনগুলোর ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে খুলে নেওয়া যন্ত্রাংশ।

বিদ্যুতের মিটারগুলো ঢেকে গেছে আগাছায়। মানুষের উপস্থিতি না থাকায় জায়গাটি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। যদিও এগুলো পরিষ্কার ও দেখাশোনার জন্য রয়েছেন একজন পাহারাদার।

কথা হয় এস্টেটের নৈশপ্রহরী বিশ্বজিৎ সরকারের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘পুরো জায়গাটা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। এত বড় একটি এলাকা একজনের পক্ষে পাহারা দেওয়া অসম্ভব। ট্রান্সফরমারগুলো চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে বিদ্যুৎ নেই। রাতে একাধিকবার ডাকাতদের মুখোমুখি হয়েছি।

বাস্তবিক অর্থে মৌলভীবাজারে উদ্যোক্তার সংখ্যা কম। বিসিক পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে বা নতুন বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করতে পারেনি। এখানে তুলনামূলক জায়গার দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই বাইরে জমি কিনেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আসাদ এগ্রো ফুডের একজন ব্যবস্থাপক জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোম্পানিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এর কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা এখানে বিনিয়োগ করার পরও বিভিন্ন বাধায় আটকা পড়েছি। এখান থেকে যেতেও পারছি না, আবার পুরোপুরিভাবে কার্যক্রমও শুরু করতে পারছি না। আমরা সীমিত পরিসরে কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। তাদের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে-কলমে।

মিফতাউল ইসলাম নামের একজন উদ্যোক্তা জানান, তিনি একটি প্লট কিনেছিলেন। তবে কোনো কার্যকরী সুবিধা না পেয়ে তা ফেরত দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বিনিয়োগকারী বলেন, দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর বরাদ্দকৃত দুটি প্লট অবশেষে ফেরত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত টাকা ফেরত পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী পুলক সূত্রধরের ভাষ্য, এখানকার জমির দাম অনেক বেশি। আমি বিসিক এস্টেটের বাইরে কম দামে জমি কিনে সেখানে কারখানা স্থাপন করেছি।

মৌলভীবাজারের একজন তরুণ উদ্যোক্তা সামি আহমেদ বলেন, বাস্তবিক অর্থে মৌলভীবাজারে উদ্যোক্তার সংখ্যা কম। বিসিক পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে বা নতুন বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করতে পারেনি। এখানে তুলনামূলক জায়গার দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই বাইরে জমি কিনেছেন।

শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল মিয়া জাগো ‍নিউজকে বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীকে সচল করতে হলে প্রথমেই প্লটের মূল্য কমিয়ে স্বাভাবিক বাজারদরের সঙ্গে মিল রাখতে হবে। মূল পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন মনে করি। এতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার ও গ্যাস-লাইনের সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপন করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পুনরুদ্ধার জরুরি বলেও মত দেন এই ব্যবসায়ী।

তিনি বলেন, ‘এসব মৌলিক সুবিধা ছাড়া কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যাপ্ত সংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ ও নিয়মিত টহলের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। পাশাপাশি বরাদ্দ পাওয়া অথচ নিষ্ক্রিয় প্লটগুলো চিহ্নিত করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে জায়গার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. মুনায়েম ওয়ায়েছ জানান, ১২২টি প্লটের মধ্যে ৬২টি বিক্রি হয়েছে। ছয়টি প্লটের কাজ খুব শিগগির শুরু হবে। এখানে মানুষ যত বাড়বে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ততই জোরদার করা হবে।

তিনি বলেন, বাস্তবিক অর্থে এই অঞ্চলে উদ্যোক্তাদের সংখ্যা কম। যারা আছেন বেশিরভাগ বাইরের। এই শিল্প নগরীর প্লট কেনার জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

ট্রান্সফরমার ও বেশ কিছু গ্যাস-লাইনের যন্ত্রাংশ চুরির বিষয়ে বিসিক শিল্পনগরীর এই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নতুন করে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আজকের সিলেট/জেএন/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর