সুচিত্রা দুরাই : ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের সেই সকালটি চেন্নাইয়ের মানুষের কাছে ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। মারিনা বিচে জেলেরা সমুদ্রে ছিলেন, শিশুরা ক্রিকেট খেলছিল। হঠাৎ বিশাল এক ঢেউ আছড়ে পড়ে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষ ভেসে যান। স্বজনেরা তখনও জানতেন না, একই সময়ে ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলেও স্থানীয় মানুষ এবং বিদেশি পর্যটকেরা একইভাবে সুনামির শিকার হন।
২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামি ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৪টি দেশে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
এই বিপর্যয় ভারতের জন্যও ছিল একটি বড় পরীক্ষা। তবে একই সঙ্গে এটি ভারতের মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ, অর্থাৎ HADR সক্ষমতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ভারতকে একই সময়ে নিজের দেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে হয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে হয়েছে। তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূল এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াতেও দ্রুত সহায়তা পাঠানো হয়।
সুনামির পর ভারত পাঁচটি বড় HADR (Humanitarian Assistance and Disaster Relief) অভিযান পরিচালনা করে। দেশের অভ্যন্তরে ছিল অপারেশন মদদ এবং অপারেশন সি ওয়েভস। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচালিত হয় অপারেশন কাস্টর মালদ্বীপে, অপারেশন রেইনবো শ্রীলঙ্কায় এবং অপারেশন গম্ভীর ইন্দোনেশিয়ায়।
এই অভিযানগুলোতে ভারতীয় নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের ৪০টিরও বেশি জাহাজ, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার এবং ২০ হাজারের বেশি সদস্য অংশ নেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, ভারত খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নামতে পেরেছিল।
সুনামির পর ভারতের এই ভূমিকা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দেশটিকে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’, অর্থাৎ সংকটের সময় দ্রুত সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে সক্ষম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই অভিজ্ঞতার পর ভারত নিজের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেও নতুন করে সাজায়। ২০০৫ সালে সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন পাস হয়। এর মাধ্যমে জাতীয়, রাজ্য ও জেলা পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার একটি কাঠামো তৈরি হয়। পরে গড়ে ওঠে জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান বাহিনী (NDRF), যা এখন বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান বাহিনী।
সুনামি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনেরও সূচনা করে। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সমন্বিতভাবে কাজ করে। পরবর্তীকালে এই চার দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত কোয়াড (Quad)-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি হয়।
এরপর গত দুই দশকে ভারত একাধিক দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত সহায়তা নিয়ে এগিয়ে গেছে।
প্রতিবেশী থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মালদ্বীপে দেশটির একমাত্র ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট নষ্ট হয়ে গেলে মারাত্মক পানীয়জল সংকট দেখা দেয়। মালদ্বীপের অনুরোধে ভারত ‘অপারেশন নীর’ শুরু করে। ভারতীয় বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যরা দিনরাত কাজ করে ১,৫০০ টনের বেশি পানীয় জল সেখানে পৌঁছে দেন। সংকটের সময় প্রথম দিকে এগিয়ে আসা দেশগুলোর অন্যতম ছিল ভারত।
২০১৫ সালের এপ্রিলে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ভারতের প্রতিক্রিয়াও ছিল দ্রুত। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শুরু হয় ‘অপারেশন মৈত্রী’। ভারতীয় ও বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধার করার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পাঠানো হয় এবং বেশ কয়েকটি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। পরে নেপালের পুনর্গঠনের জন্য ভারত প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভারত আবারও দ্রুত সাড়া দেয়। ‘অপারেশন দোস্ত’-এর আওতায় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক এবং প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড পাঠানো হয়। ২৫০ জনের বেশি সদস্যের এসব দল উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নেয়।
আফ্রিকাতেও ভারত একই ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৯ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত মোজাম্বিক এবং ২০২৩ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মালাউইয়ে ভারত ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পাঠায়।
২০২৫ সালের মার্চে মিয়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভারত ‘অপারেশন ব্রহ্মা’ শুরু করে। NDRF (National Disaster Response Force) এবং তিন সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানে ৭৫০ মেট্রিক টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়। মান্দালয়ে একটি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হয় এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য প্রকৌশলী দলও পাঠানো হয়।
একইভাবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’-এ ক্ষতিগ্রস্ত শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়ায় ভারত। ‘অপারেশন সাগর বন্ধু’-এর মাধ্যমে ওষুধ, জরুরি সরঞ্জাম এবং ১,০০০ টনের বেশি শুকনো খাবার পাঠানো হয়।
এ ধরনের সহায়তার পরিধি এখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও দূরে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ২৬ জুন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভেনেজুয়েলায় ভারত দুটি C-17 বিমানে করে ৩০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠায়। সঙ্গে ছিল উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসকদের ৪১ সদস্যের একটি দল। ভৌগোলিক দূরত্বের কথা বিবেচনা করলে এটিও ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য HADR উদ্যোগ।
দুর্যোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সহায়তাতেও ভারত
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারতের মানবিক সহায়তার আরেকটি বড় উদাহরণ ছিল ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ভারত ৯৯টি দেশ এবং দুটি জাতিসংঘ সংস্থাকে প্রায় ৩০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করে। ভ্যাকসিনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশকে ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীও দেওয়া হয়।
এ থেকে স্পষ্ট যে ভারতের কাছে HADR এখন আর শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ পাঠানোর বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
২০১৫ সালে মরিশাস সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘সাগর’ (SAGAR: Security and Growth for All in the Region) ধারণাটি তুলে ধরেন। এর মূল বক্তব্য ছিল, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ভারতকে একটি দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। পরে ২০১৯ সালের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক ওশানস ইনিশিয়েটিভ’ (IPOI) এবং ২০২৫ সালের ‘মহাসাগর’ (MAHASAGAR) উদ্যোগের মাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হয়।
তবে ভারতের HADR নীতি শুধু দুর্যোগ ঘটার পর সাড়া দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও ভারত গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ‘কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (CDRI)। দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার এই উদ্যোগে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে ৬০টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত CDRI ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিদ্যালয়, হাসপাতাল, আবাসন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তুলতে কাজ করছে।
দুই দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারতের HADR সক্ষমতা এখন অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক এবং সুসংগঠিত। প্রয়োজন দেখা দিলে দ্রুত বিমান পাঠানো, জাহাজ মোতায়েন করা, ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা কিংবা উদ্ধারকারী দল পাঠানোর সক্ষমতা ভারত তৈরি করেছে।
এই কারণেই ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে ভারতের দিকে এখন অনেকেই তাকিয়ে থাকে। সংকটের সময় দ্রুত উপস্থিত হওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনে অংশ নেওয়ার এই সক্ষমতাই ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
(লেখক : থাইল্যান্ডে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং কেনিয়ায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার)









