রেমা-কালেঙ্গার গভীর বনে বিরল মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৫ AM

রেমা-কালেঙ্গার গভীর বনে বিরল মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২১/০৯/২০২৬ ০৯:৩৪:২৩ AM

রেমা-কালেঙ্গার গভীর বনে বিরল মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল


হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য যেন সবুজের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক আলাদা জগৎ। গাছপালায় ঘেরা এই বিস্তীর্ণ বন শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করে না, এটি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থলও। গাছের মগডালে প্রায়ই দেখা মেলে বিরল নানা প্রাণীর। তাদের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল বা মালয়ান বড় কাঠবিড়ালি।

সুন্দরবনের পর আয়তন ও প্রাচীনতার দিক থেকে রেমা-কালেঙ্গার অবস্থান দ্বিতীয়। শুষ্ক ও চিরহরিৎ এই বনাঞ্চলটি জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ বন। ১৯৮২ সালে রেমা-কালেঙ্গাকে অভয়ারণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৯৬ সালে এর পরিধি বাড়ানো হয়। বর্তমানে অভয়ারণ্যটির আয়তন ১৭৯৫.৫৪ হেক্টর।

রেমা-কালেঙ্গা বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যগুলোর একটি। প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা দেশের বনগুলোর মধ্যে এটিও তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে। পুরো বনাঞ্চল রেমা, কালেঙ্গা, ছনবাড়ি ও রশিদপুর—এই চারটি বিটে বিভক্ত। বনের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে রয়েছে ১১টি ইউনিট ও ৭টি ক্যাম্প।

এই অভয়ারণ্যে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২১৫ প্রজাতির পাখি, সাত প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্মের সন্ধান পাওয়া যায়। বিরল ও বৈচিত্র্যময় পাখির উপস্থিতির জন্যও রেমা-কালেঙ্গা পরিচিত। ভীমরাজ, টিয়া, পাতি ময়না, লালমাথা কুচকুচি, সিপাহি বুলবুল, রাজ ধনেশ, শকুন, কালো মথুরা, লাল বনমোরগ, প্যাঁচা, মাছরাঙা, ঈগল ও চিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যায়।

বানরেরও রয়েছে বৈচিত্র্য। বনে তিন প্রজাতির বানর—উল্টোলেজি বানর, লাল বানর ও নিশাচর লজ্জাবতী বানর। পাশাপাশি রয়েছে পাঁচ প্রজাতির কাঠবিড়ালি। এর মধ্যে মালয়ান বড় কাঠবিড়ালি সবচেয়ে বিরলগুলোর একটি এবং বাংলাদেশে একমাত্র এই বনেই পাওয়া যায়।

মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমান, উল্লুক, মায়া হরিণ, মেছোবাঘ, দেশি বন শূকর, গন্ধগোকুল, বেজি ও সজারুর মতো প্রাণীরও আবাস এই বনে। সরীসৃপের মধ্যে রয়েছে শঙ্খচূড়, দুধরাজ, দাঁড়াশ ও লাউডগাসহ ১৮ প্রজাতির সাপ। গাছের উঁচু ডালে এসব সাপ, পাখি, কাঠবিড়ালি, বানর ও হনুমানের চলাচল চোখে পড়ে।

তবে গাছের মগডালে সবচেয়ে সহজে আলাদা করে নজর কাড়ে মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল। সাধারণ কাঠবিড়ালির তুলনায় আকারে অনেক বড় এই প্রাণীটি দ্রুত এক ডাল থেকে আরেক ডালে ছুটে বেড়ায়। পূর্ণবয়স্ক একটি প্রাণীর শরীরের দৈর্ঘ প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার হতে পারে। লেজও প্রায় শরীরের সমান লম্বা হওয়ায় মাথা থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত দৈর্ঘ এক মিটারের বেশি হয়। ওজন প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

কালো, বাদামি কিংবা লালচে-মেরুন রঙের শরীর এবং ঘন, ঝোপালো লেজ মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলকে অন্য কাঠবিড়ালি থেকে সহজেই আলাদা করে। গাছের মগডালে দ্রুত চলাচলের সময় লম্বা লেজটি প্রাণীটির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দেব বলেন, বড় ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণ না করলে জায়ান্ট স্কুইরেলের মতো প্রাণী টিকিয়ে রাখা কঠিন। গহিন বন ও প্রবীণ বৃক্ষ কমে গেলে এসব প্রাণী একই সঙ্গে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় হারাবে।

কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, রেমা-কালেঙ্গায় মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের উপস্থিতি বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বিরল প্রাণীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে অভয়ারণ্যটি এখনো বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে টিকে আছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রয়োজন।

পর্যটকদের জন্যও আগের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে বলে জানান তিনি। আল আমিন বলেন, কয়েক বছর আগেও বনে পর্যটকদের থাকার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। এখন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বনকে ঘিরে গবেষণাও করেন। তবে পর্যটকদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে বন্যপ্রাণীরা ভয় না পায়। নির্ধারিত ট্রেইলে নীরবে ও সাবধানতার সঙ্গে চললে অনেক বিরল প্রাণীর দেখা পাওয়া সম্ভব।

বন্যপ্রাণী প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতাও দরকার। বনকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে এবং বন ধ্বংস হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। গাছ কাটা থেকেও বিরত থাকতে হবে। পর্যটকদেরও নির্ধারিত ট্রেইলে সাবধানে ও নীরবে ভ্রমণ করতে হবে, যাতে বন্যপ্রাণীরা আতঙ্কিত না হয়। এসব প্রাণী প্রকৃতিপ্রেমীদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়।

রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের অবস্থান হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। তবে বনটি হবিগঞ্জের সীমানা ছাড়িয়ে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত।

ঢাকা থেকে সড়কপথে রেমা-কালেঙ্গার দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। হবিগঞ্জ জেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে বাস অথবা ট্রেনে শায়েস্তাগঞ্জে নেমে সিএনজি অটোরিকশায় চুনারুঘাট যাওয়া যায়। এরপর আরেকটি সিএনজি নিয়ে পৌঁছানো যায় রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে। চাইলে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ নিয়েও সরাসরি যাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে খরচ প্রায় ৫০০ টাকা হতে পারে।

একসময় রাত কাটানোর সুযোগ না থাকলেও এখন রেমা-কালেঙ্গায় রয়েছে বেশ কয়েকটি কটেজ। আগে থেকে বুকিং করে দিনে ও রাতে সেখানে থাকা যায়। রাতের বেলায় বনের ভিন্ন রূপ উপভোগের পাশাপাশি কিছু বিরল প্রাণীরও দেখা মিলতে পারে। ভোরে বাঘ, হরিণ, খরগোশসহ বিভিন্ন প্রাণী দেখা যায় বলে জানানো হয়েছে।

পর্যটকদের খাবারের জন্য সেখানে একটি রেস্টুরেন্টও রয়েছে। তবে সেখানে খাবারের জন্য আগে থেকেই অর্ডার করে রাখতে হয়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর