সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহরের কেন্দ্রের কাছেই বসবাস করেও নাগরিক সুবিধার বাইরে রয়েছে প্রায় ৪০ পরিবার। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার বাসিন্দাদের ঘরে এখনো পৌঁছেনি বিদ্যুৎ। নেই চলাচলের পাকা রাস্তা, নেই স্থায়ী সেতুও। বর্ষায় দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো আর হেমন্তে জমির আইল ধরে চলাচল করেই দিন কাটছে তাদের।
সন্ধ্যা নামার পর পুরো এলাকা যেন ফিরে যায় পুরোনো দিনের জীবনে। বিদ্যুতের পরিবর্তে হারিকেন ও কুপির আলোতেই রাত পার করেন বাসিন্দারা। এতে শিশুদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া দৈনন্দিন নানা কাজেই ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের।
দিরাই পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। ১৯৯৯ সালে গঠিত দিরাই পৌরসভায় বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ড ও ২৯টি মহল্লা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভরারগাঁও উত্তরপাড়ায় প্রায় ৪০টি পরিবারের বসবাস। এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরি করে জীবিকা চালান। আশপাশের জনপদ ও মূল সড়কের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বর্ষাকালে তাদের ভরসা একটি দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো। পানি কমে গেলে সেই সাঁকোর প্রয়োজন পড়ে না, তবে তখন জমির আইলই হয়ে ওঠে চলাচলের পথ।
বাসিন্দারা জানান, বর্ষায় বাঁশের সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন শিশু, বয়স্ক ও নারীরা। জরুরি প্রয়োজনে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা গর্ভবতী নারীকে দ্রুত মূল সড়কে নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ, রাস্তা ও নিরাপদ যোগাযোগের দাবিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী প্রার্থীরাও সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বছর পেরোলেও স্থায়ী কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার বাসিন্দা ইকরাম আলী বলেন, ‘আমরা পৌরসভার মধ্যে বসবাস করেও শহরের কোনো সুবিধা পাই না। বিদ্যুৎ নেই, ভালো রাস্তা নেই। বর্ষাকালে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে চলাচল করতে হয়। বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।’
আকরম আলীর অভিযোগ, নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা এলাকায় এসে নানা প্রতিশ্রুতি দেন। বিদ্যুৎ সংযোগ ও রাস্তা নির্মাণের আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু ভোট শেষ হলে তাদের আর দেখা যায় না।
সাহেব আলী বলেন, ‘আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। পৌর এলাকার বাসিন্দা হয়েও হারিকেনের আলোয় থাকতে হচ্ছে। হেমন্তে জমির আইল আর বর্ষায় সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে—এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের।’
জোনাব আলীর ভাষায়, বর্ষাকালে বাঁশের সাঁকো পারাপারই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয়। শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ তখন আরও বেড়ে যায়। তার মতে, একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা গেলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমত।
জাসাসের দিরাই পৌর সভাপতি মাসুদ চৌধুরী বলেন, ভরারগাঁও উত্তরপাড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। পৌরসভার একটি এলাকায় বছরের পর বছর মানুষ বিদ্যুৎ ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত থাকাকে তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের দাবি, পৌর শহরের এত কাছে থেকেও বছরের পর বছর মৌলিক নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত থাকার অবসান চান তারা। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বাঁশের সাঁকোর জায়গায় স্থায়ী সেতু এবং চলাচলের উপযোগী রাস্তা নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে দিরাই পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমরা দেখব কী করা যায়।’
আজকের সিলেট/ জেকেএস
দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি 








