সুনামগঞ্জে ভর্তুকির সার পাচারের অভিযোগ, ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৬ PM

সুনামগঞ্জে ভর্তুকির সার পাচারের অভিযোগ, ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২১/০৯/২০২৬ ০৯:৩৩:৫৬ AM

সুনামগঞ্জে ভর্তুকির সার পাচারের অভিযোগ, ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন


সুনামগঞ্জে কয়েকজন সার ডিলারের বিরুদ্ধে সরকারি ভর্তুকির সার নিয়মবহির্ভূতভাবে উত্তোলন ও পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, বিএডিসির গুদাম ও শ্রমিকসংশ্লিষ্ট একটি চক্রের সহায়তায় অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।

অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র নিজেদের বরাদ্দের পাশাপাশি অন্য ডিলারদের বরাদ্দের সারও নিয়মের বাইরে উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে। এতে বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলে সারের সংকট তৈরি হচ্ছে এবং কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কিনে চাষাবাদ করতে হচ্ছে।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মে সুনামগঞ্জের মল্লিকপুরস্থ বিএডিসি গুদাম থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার উত্তোলন করছিলেন জামালগঞ্জের ডিলার আবুল কালাম। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ১৮ জন ডিলারের সার একাই উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিলম্বে সার উত্তোলনের বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পাল ঘটনাস্থলে গিয়ে চালানটি আটক করেন।

ঘটনাটি তদন্তে বিএডিসি একটি কমিটি গঠন করে। পরে গুদাম কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। তবে এখনো আবুল কালামের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

সার পাচারের অভিযোগ রয়েছে ধর্মপাশার ডিলার শামছু মিয়া ও তাহিরপুরের বাদাঘাটের ডিলার হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও। হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে সার পাচারের মামলা চলমান রয়েছে বলেও জানা গেছে।

কৃষক আন্দোলনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী চালান কাটার পর ওই দিনই ডিলারের সার উত্তোলন করার কথা। এরপর কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে তা গুদামজাত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা সরেজমিনে গুদামে না গিয়ে ডিলারদের কথার ভিত্তিতে এরাইভাল রিপোর্ট দিয়ে সার পাচারের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

তাঁদের আরও অভিযোগ, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ডিলারদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সরেজমিনে গুদাম পরিদর্শন না করেই এরাইভাল রিপোর্ট দিচ্ছেন। এ ধরনের অভিযোগের পর গত ১৩ মে জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। পরে বিষয়টি কৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে জামালগঞ্জের আবুল কালামসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার উত্তোলনের ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছে বিএডিসি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা সরেজমিনে এসে বিষয়টি পরিদর্শনও করেছেন। এরপরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, সরকার প্রতি বস্তা সারে ৫ হাজার টাকার বেশি ভর্তুকি দেয়। গুদামে সার সরবরাহকারী ঠিকাদার চক্র, স্থানীয় ডিলার ও গুদামসংশ্লিষ্ট একটি চক্রকে ম্যানেজ করে এই ভর্তুকির সার বিভিন্ন সময় পাচার করা হয়। এর ফলে মৌসুমে সুনামগঞ্জে সার সংকট দেখা দিলে কৃষকদের বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়।

তাঁদের দাবি, মৌসুমে সুনামগঞ্জ আব্দুজ জহুর সেতু পার করে সার নিয়ে যেতে পারলেই সিন্ডিকেট প্রতি ট্রাকে ১ লক্ষ টাকা করে পায়। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার এক বস্তা সারে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা ভর্তুকি দিয়ে থাকে। জেলায় বর্তমানে বিএডিসি ও বিসিআইসির ১৪৮ জন ডিলার রয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ডিলারের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনের একটি সিন্ডিকেট সরকারি ভর্তুকির সার পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গুদাম থেকে সার উত্তোলনের সময় এবং গুদামে নিয়ে আসার পথেও পাচারের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ডিলাররা। হাফিজুর রহমান বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। তবে তিনি কোনো পাচার বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর বরাদ্দের সার স্থানীয় কৃষকেরাই পান এবং তিনি নিয়মিত মাস্টাররোল সংরক্ষণ করেন।

জামালগঞ্জের ডিলার আবুল কালাম বলেন, তিনি বর্তমানে হাসপাতালে আছেন, পরে ফোন দিতে হবে। এরপর তাঁর সঙ্গে আর ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ধর্মপাশার ডিলার শামছু মিয়া বলেন, স্ট্রোকের কারণে তাঁর অপারেশন হয়েছে এবং তিনি এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, গুদামে সার মজুদ রেখে এরাইভাল রিপোর্ট দেওয়ার ঘটনায় জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁরা ডিলারদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের কাছেও জবাব দিয়েছেন। ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তা এ ধরনের কাজ করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বিএডিসির সিলেট বিভাগের উপপরিচালক (সার) হুমায়ুন কবীর বলেন, সুনামগঞ্জ বা সিলেটে সার পাচারের কোনো সুযোগ নেই। সার উত্তোলনে যারা অনিয়ম করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে এসে বিষয়টি পরিদর্শনও করেছেন। অভিযুক্ত ১৭ ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর