নদী আছে, স্রোত নেই: সুনামগঞ্জের ২৬ নদীতে সংকটের ছায়া
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ AM

নদী আছে, স্রোত নেই: সুনামগঞ্জের ২৬ নদীতে সংকটের ছায়া

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৯/০৯/২০২৬ ০৯:২১:০৩ AM

নদী আছে, স্রোত নেই: সুনামগঞ্জের ২৬ নদীতে সংকটের ছায়া


একসময় নদীর বুক চিরে ছুটত লঞ্চ, কার্গো ও বড় বড় নৌকা। জেলেদের জালে উঠত মাছ, আর এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার সহজ পথ ছিল নৌযান। উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও খাসিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি সুনামগঞ্জের নদীগুলো দিয়ে বয়ে নিয়ে যেত হাওরাঞ্চলের প্রাণ।

সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। নদী আছে, কিন্তু অনেক নদীতে নেই আগের স্রোত। কোথাও পলি জমে উঁচু হয়েছে তলদেশ, কোথাও দখলে সংকুচিত হয়েছে নদীর বুক। আবার কোনো কোনো নদীতে জমছে বর্জ্য ও প্লাস্টিক। বালু-পাথর উত্তোলনের চাপে কোথাও বদলে গেছে নদীর তলদেশ ও দুই পাড়ের চেহারা। কোনো নদী শুকিয়ে ধীরে ধীরে মরা খাল কিংবা চরে পরিণত হচ্ছে। 

আরও পড়ুন: সুরমার কান্না শুনছে কি সিলেট?

সুনামগঞ্জের ২৬টি নদীর বাস্তব পরিস্থিতি খুঁজতে গিয়ে এমনই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

বালু-পাথরে বিপন্ন জাদুকাটা

সুনামগঞ্জের আলোচিত নদীগুলোর একটি জাদুকাটা। ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা এ নদীর স্বচ্ছ পানি, নীলাভ প্রবাহ এবং দুই পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। কিন্তু অবাধে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে নদীটি এখন বিপন্নতার মুখে।

জাদুকাটায় অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার অভিযোগও পুরোনো। কোথাও নদীর তলদেশ কেটে বালু তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও কেটে ফেলা হচ্ছে নদীর পাড়। এতে নদীর স্বাভাবিক তলদেশ ও প্রবাহের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদেরা।

আরও পড়ুন: সুরমার কান্না শুনছে কি সিলেট?

যেখানে নদীর বুকে ধান

নদীর নাব্যতা হারানোর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি পুরোনো সুরমা বা মরা সুরমা। প্রায় ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি সুনামগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ, দিরাই ও শাল্লা হয়ে ধনু নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

একসময় বড় নৌযান চলাচল করলেও পলি ও বালু জমে নদীটির অনেক অংশ এখন নাব্যতা হারিয়েছে। কোথাও তলদেশ এতটাই ভরাট হয়েছে যে সেখানে ধান চাষ করছেন স্থানীয়রা। কোথাও আবার মানুষ হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন।

শান্তিগঞ্জের নারায়ণপুর থেকে পাথারিয়া-শরিফপুর পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন জায়গায় শুকিয়ে যাওয়া বা ভরাট হয়ে যাওয়ার চিত্র দেখা যায়। হেমন্তে এসব জায়গায় স্থানীয়রা ধান চাষ করেন। নদীর তলদেশকে মাঠ বানিয়ে যুবকদের ফুটবল-ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতেও দেখা যায়।

রক্তি নদীতে ভরাট, দখল ও নাব্য সংকট

জাদুকাটার পাশাপাশি নাব্যতার সংকটে পড়েছে রক্তি নদীও। প্রতি বছরের মার্চে বিশ্বম্ভরপুর অংশের কাটাখালী-নিয়ামতপুর-সুরমা পর্যন্ত প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকায় ভরাটের কারণে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শুধু ভরাট নয়, নদী দখলের সমস্যাও রয়েছে। গৌরারং ইউনিয়নের নিয়ামতপুর, ফিরোজপুর ও নলুয়ারপাড় এলাকায় নদী দখল করে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রস্থ কমে কোথাও কোথাও রক্তি নদী সরু খালের মতো হয়ে গেছে।

অর্থাৎ এ নদীর সংকটের সঙ্গে একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভরাট, দখল ও নাব্যতা হ্রাস।

আরও পড়ুন: সুরমার কান্না শুনছে কি সিলেট?

সুরমার পাড়ে বর্জ্যের চাপ

সুনামগঞ্জের প্রাণ হিসেবে পরিচিত সুরমা নদীও সংকটমুক্ত নয়। পলি জমে নাব্যতা কমার পাশাপাশি নদীর তীর দখল, বাজারের বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্য নদীটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

জামালগঞ্জ এলাকায় সুরমার দুই পাড়ে বড় বড় বাজার থাকায় নদীতে বর্জ্য ও পলিথিন ফেলার প্রবণতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদী। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা।

কুশিয়ারায় বদলে যাচ্ছে নদীর মানচিত্র

সুনামগঞ্জের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী কুশিয়ারার সংকটও বহুমুখী। নদীভাঙনের পাশাপাশি বালু উত্তোলন ও দখলের কারণে বদলে যাচ্ছে নদীটির স্বাভাবিক চেহারা।

শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন অংশে নদীপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও চর জেগে উঠছে, যা চাষাবাদের উপযোগী হয়ে উঠছে। আবার নদীভাঙনে অনেক বাড়িঘর বিলীন হওয়ায় বাস্তুচ্যুত হচ্ছে শত শত পরিবার।

সরেজমিনে দেখা যায়, কুশিয়ারা-কালনীর মিলনস্থল মার্কুলী টুকচানপুরে স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়ায় সেখানে গড়ে উঠেছে বসতি ও বাজার।

আরও পড়ুন: সুরমার কান্না শুনছে কি সিলেট?

২৬ নদীর সংকট, প্রশ্ন একটাই

রক্তি, আপার ধোলাই, সোমেশ্বরী, মনাই, মাই, বৌলাই, কংস, পাটনাই, জাদুকাটা, নাইন্দা, কানদী, কুশিয়ারা, চামতি, দারাইন, মহাসিং, ডাউকা, বিবিয়না, হেরা চামতি, কামারখালী, চলতি, পুরাতন সুরমা, নলজুর ও সুরমা—সরকারি ও স্থানীয় বিভিন্ন তালিকায় এসব নদীর নাম পাওয়া যায়।

তবে তালিকাভেদে নদীর সংখ্যা ও নামের ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও শাখা-উপনদী এবং মৃত নদীকেও আলাদাভাবে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা থাকলেও বাস্তব সংকটের জায়গাটি একই।

কোনো নদী বালু-পাথর উত্তোলনের চাপে, কোনোটি পলি জমে, কোনোটি দখলে, আবার কোনোটি বাজারের বর্জ্যে বিপর্যস্ত। কোথাও নদী হারাচ্ছে তার নাব্যতা, কোথাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর অস্তিত্বই।

নদী হারিয়ে গেলে শুধু একটি জলধারা হারায় না। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় নৌপথ, মাছ, কৃষির পানি, হাওরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন ও অর্থনীতি।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জের নদী রক্ষায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, নদী খনন করা গেলে নৌপথ সচল হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ও জেলার অর্থনীতিও গতি পাবে।

সুনামগঞ্জের নদীগুলোর সামনে তাই প্রশ্ন শুধু নাব্যতা ফেরানোর নয়; প্রশ্ন হলো, একসময় যে নদীগুলো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন ছিল, সেগুলোকে আবার কতটা প্রবাহমান করে তোলা যায়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর