পাইপলাইনে গ্যাস থাকলেও রাজধানীর অনেক বাসাবাড়িতে চুলায় ঠিকমতো গ্যাস মিলছে না। দীর্ঘদিনের এই সংকটে রান্নার বিকল্প হিসেবে বাড়ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার। তবে বিকল্প এই জ্বালানির বাজারেও স্বস্তি নেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ থেকে হাজার টাকা বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবার বাড়তি দাম দিয়েও সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
এর মধ্যেই অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
বিইআরসি জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে। অক্টোবর মাসে ভ্যাটসহ বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এই দাম ছিল ১৩২ টাকা ১২ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ২০ টাকা ৯৪ পয়সা।
শুধু ১২ কেজির সিলিন্ডার নয়, অন্যান্য ওজনের এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন নির্ধারিত দরে ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডার ৮৪২ টাকা, ১২ দশমিক ৫ কেজি ১ হাজার ৯১৩ টাকা, ১৫ কেজি ২ হাজার ২৯৬ টাকা, ১৬ কেজি ২ হাজার ৪৪৯ টাকা, ১৮ কেজি ২ হাজার ৭৫৫ টাকা, ২০ কেজি ৩ হাজার ৬১ টাকা, ২২ কেজি ৩ হাজার ৩৬৭ টাকা, ২৫ কেজি ৩ হাজার ৮২৭ টাকা এবং ৩০ কেজির সিলিন্ডার ৪ হাজার ৫৯২ টাকা।
এ ছাড়া ৩৩ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৫ হাজার ৫১ টাকা, ৩৫ কেজির ৫ হাজার ৩৫৭ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৬ হাজার ৮৮৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে। প্রতি লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা। সেপ্টেম্বরে অটোগ্যাসের দাম ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা।
বিইআরসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সৌদি আরামকোর অক্টোবর মাসের প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি) বেড়ে যাওয়ায় এলপিজির নতুন দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
অক্টোবরে প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার। প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ ধরে গড় সৌদি সিপি ধরা হয়েছে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার। সেপ্টেম্বরে এই গড় ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৫ ডলার।
এর পাশাপাশি এলপিজি আমদানির জাহাজভাড়া ও ব্যবসায়িক প্রিমিয়ামও বেড়েছে। অক্টোবরে প্রতি মেট্রিক টনে এ খাতে ২৫০ ডলার বিবেচনায় নিয়েছে বিইআরসি। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১৬০ ডলার। অর্থাৎ এই ব্যয় বেড়েছে ৯০ ডলার।
অক্টোবরের দাম নির্ধারণে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ধরা হয়েছে ১২৩ টাকা ১৮ পয়সা। সেপ্টেম্বরে তা ছিল ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা। ফলে ডলারের বিনিময় হারে বড় ধরনের চাপ না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধিই এবার দাম বাড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে এসেছে।
নতুন দাম ঘোষণার সময়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাবে কি না। সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ বিভিন্ন এলাকায় সেটি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে নতুন সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণের পরও বাজারে যদি আগের মতো অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রি হয়, তাহলে ভোক্তার ব্যয় কমার বদলে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটে বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি এই ব্যয় বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
এলপিজির সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও রয়েছে ভিন্ন বক্তব্য। সরকার ও আমদানিকারকদের একাংশের দাবি, দেশে এলপিজির সামগ্রিক মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তবে খুচরা বাজারের চিত্রে অনেক এলাকায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি ও কার্গো সংকটের কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে ডিলারদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ দিচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) সরকারের কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা এলপিজির একটি অংশ বাজারে না ছেড়ে মজুত করে রাখার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে আইগ্যাস, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয় এবং নাম আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বড় আমদানিকারকদের হাতে থাকা এলপিজির মজুত যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। একই সঙ্গে কোন চালান কখন দেশে এসেছে, কখন খালাস হয়েছে, কতটা গুদামে ছিল এবং কতটা বাজারে ছাড়া হয়েছে এসব তথ্য পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে।
এ অবস্থায় শুধু নতুন দাম ঘোষণা নয়, বাজারে সেই দাম কার্যকর হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করাই এখন বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ নির্ধারিত দাম থাকলেও ভোক্তা যদি সেই দামে সিলিন্ডার না পান, তাহলে ঘোষণার সুফল তার কাছে পৌঁছাবে না।
বিইআরসি জানিয়েছে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতাসহ কোনো পর্যায়েই কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বোতলজাত এলপিজি, রেটিকুলেটেড এলপিজি বা অটোগ্যাস বিক্রি করা যাবে না। অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনকে বাজার তদারকি জোরদারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









