শুক্রবার-শনিবারও চলে পাঠদান। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাস, এরপর বিকেল ৪টা পর্যন্ত নিয়মিত পাঠ। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষে বসেন তাঁদের অভিভাবকেরাও। শিক্ষক কীভাবে পড়া বোঝান, তা দেখে বাড়িতে সন্তানকে সহযোগিতা করেন তাঁরা।
এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও কাব স্কাউটে সাফল্যের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শ্রীমঙ্গল শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী ৭২২ জন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পঞ্চম শ্রেণির জন্য বিশেষ ক্লাস চালু রাখা এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। এর অংশ হিসেবে শুক্রবার ও শনিবারও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পাঠদান করা হয়। কোনো কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলা এসব ক্লাসে প্রধান শিক্ষক নিজেই পড়ান।
এ উদ্যোগের আরেকটি দিক হলো অভিভাবকদের শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ। সন্তানকে কীভাবে পড়ানো হচ্ছে, তা সরাসরি দেখার সুযোগ পান তাঁরা। পরে বাড়িতে একই পদ্ধতি অনুসরণ করে পড়াশোনায় সহায়তা করতে পারেন।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেবার্ঘ দেবের মা দেবদ্রুতি পাল চৌধুরী বলেন, “সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাসের পর আবার ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস হয়। মাঝেমধ্যে আমাদেরও সন্তানের সঙ্গে ক্লাসে বসতে হয়। স্যার কীভাবে বুঝিয়ে পড়ান, আমরা সেটা দেখি এবং পরে বাসায় সহযোগিতা করি।”
তিনি জানান, অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো বাড়তি টাকা দিতে হয় না।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদিবা হুসেনের বাবা ও শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লোকমান হোসেনও বিদ্যালয়টির পাঠদান পদ্ধতির প্রশংসা করেন।
তাঁর ভাষায়, “এটি আর দশটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো নয়। এখানে শিক্ষার মান ভালো। আমার মেয়ের বেসিক অনেক ভালো হয়েছে। বিদ্যালয়ের নিয়ম ও পড়ানোর পদ্ধতি শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে পিছিয়ে পড়ার সুযোগ কম।”
পড়াশোনার পাশাপাশি কাব স্কাউটেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের। ২০২১ সালের শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ জনের মধ্যে সাতজন এই সম্মাননা অর্জন করে। পরবর্তী বছরগুলোতেও এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। কোনো বছর সাতজন, কোনো বছর আটজন, আবার কোনো বছর নয়জন শিক্ষার্থী অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ২০২৫ সালে এ সম্মাননা অর্জন করে সাতজন।
বিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে শিক্ষার্থীদের অর্জিত শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ স্কাউটসের কাব স্কাউট শাখায় ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এটি সর্বোচ্চ সম্মাননা।
সহকারী শিক্ষক প্রণবেশ চৌধুরী অন্তু বলেন, বিদ্যালয়ে কেবল পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীতের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে, যেগুলোর দায়িত্বে রয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।
তিনি জানান, কাব স্কাউটের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায়ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পেয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয় বিদ্যালয়টিতে। গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মতো মূল্যবোধ শেখানোর পাশাপাশি নৃত্য, আবৃত্তি, সংগীত ও একক অভিনয়ের চর্চার সুযোগ রয়েছে।
সহকারী শিক্ষিকা মহামায়া শর্মা বন্যা বলেন, মাত্র ১৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে ৭২২ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকেরা সন্তানদের ভর্তি করাতে আসেন।
তিনি বলেন, জায়গার সংকটে অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে এবং আগের মতো দুই শিফটে ক্লাস চালু করা গেলে আরও শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেওয়া যেত।
প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার মনে করেন, বিদ্যালয়ের সাফল্য এক দিনের পরিশ্রমে আসেনি; এর জন্য প্রয়োজন হয়েছে সময়, ধৈর্য ও ধারাবাহিক উদ্যোগের।
তিনি বলেন, কোনো পরিশ্রমের ফল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। প্রয়োজন সময় ও ধৈর্য। আমাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম তখনই সার্থক মনে হয়, যখন দেখি দেশের সবচেয়ে বেশি শাপলা কাব পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছি কিংবা বৃত্তির ফলাফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান সেরা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, একুশ শতকের সুনাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি তাদের মধ্যে নৈতিকতা, সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি করতে চান তাঁরা।
সহকারী শিক্ষক লাভলী দত্ত বলেন, তিনি বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দেখছেন, প্রধান শিক্ষক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস নেন এবং শুক্রবার-শনিবারও সময় দেন। তাঁর মতে, এ উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীরা ভালো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামও বিদ্যালয়টির উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জায়গা কম হলেও শিক্ষার্থী অনেক এবং শিক্ষকরা, বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক, তাদের জন্য বাড়তি পরিশ্রম করেন। বিভিন্ন সভা ও আলোচনায় অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরা হয়।
তাঁর মতে, ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদের পরিশ্রমের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা, বিদ্যালয়ের অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থাও ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রীমঙ্গলের ৪৫টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২৯ জন প্রাথমিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল ৩৪ জন। ওই অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও দর্শকদের প্রশংসা পায়।
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুনামের কথা তিনি শুনেছেন এবং বিদ্যালয়টির সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও দেখেছেন।
তিনি জানান, বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও নিজ নিজ জায়গা থেকে ভালো কাজ করে সুনাম অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি 








