শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯ অপরাহ্ন

মহালয়া আজ

‎পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের সূচনায় ধরণীতে জাগছে জগন্মাতার আগমনী বার্তা

জনি কান্ত শর্মা

প্রকাশিত: ১০/১০/২০২৬ ০৮:৪৩:০৬ পূর্বাহ্ন

‎পিতৃপক্ষের অবসান, দেবীপক্ষের সূচনায় ধরণীতে জাগছে জগন্মাতার আগমনী বার্তা


যা চণ্ডী মধুকৈটভাদিদৈত্যদলনী, যা মাহিষোন্মূলিনী, যা ধূম্রলোচন-চণ্ড-মুণ্ডমথনী, যা রক্তবীজবিনাশিনী সেই শক্তিরূপিণী, অসুরদলনী ও সিদ্ধিদাত্রী জগজ্জননী দেবী দুর্গার বন্দনায় আজ মুখরিত বাঙালির হৃদয়। শরতের স্নিগ্ধ প্রভাতে শঙ্খধ্বনি, চণ্ডীপাঠ ও আগমনী গানের সুরে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে শারদীয় উৎসবের আবহ। শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোলা আর শিশিরস্নাত প্রকৃতি যেন জানিয়ে দিচ্ছে, মা আসছেন। পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনালগ্ন মহালয়াকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরাজ করছে ধর্মীয় আবেগ, ভক্তি ও নতুন আশার সঞ্চার।

আজ মহালয়া। পূর্বপুরুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং দেবী দুর্গার আগমনী বার্তাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাঙালি অপেক্ষা করছে শারদীয় দুর্গোৎসবের। মহালয়া শুধু একটি ধর্মীয় তিথি নয়; এটি স্মৃতি, শ্রদ্ধা, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও আনন্দের এক অনন্য সম্মিলন। এই দিন থেকেই বাঙালির মনে দুর্গাপূজার প্রতীক্ষা নতুন মাত্রা পায়।

হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বাঙালির লোকাচারে মহালয়ার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে। এদিন প্রয়াত পিতৃপুরুষদের স্মরণে তর্পণ, শ্রাদ্ধ ও প্রার্থনার প্রচলিত রীতি রয়েছে। অন্যদিকে, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের আগমনী আবহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনাকে ঘিরে মানুষের অপেক্ষার নতুন অধ্যায়।

পিতৃপক্ষের দিনগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকে তাঁদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় জল, তিল ও অন্যান্য উপকরণ নিবেদন করে তর্পণ করেন। নদীতীর, পুকুরঘাট কিংবা নির্ধারিত স্থানে মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে পালিত হয় এ ধর্মীয় আচার। পাশাপাশি পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণ, তাঁদের অবদান স্মৃতিচারণ এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে জীবনের শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপিত হয়।

মহালয়া তাই অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক গভীর সেতুবন্ধন। যাঁদের হাত ধরে পরিবার, সমাজ ও প্রজন্মের পথচলা, তাঁদের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না। পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে মানুষ যেমন অতীতকে স্মরণ করে, তেমনি নতুন দিনের প্রত্যাশায় এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও খুঁজে পায়।

দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ও পুরাণে। বিশেষ করে মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্যম্, যা শ্রীশ্রীচণ্ডী নামেও পরিচিত, সেখানে দেবীর অসুরবিনাশিনী রূপের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে।

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবলোক বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূত হন মহাশক্তি দেবী দুর্গা। দেবতাদের অস্ত্র ও শক্তিতে সজ্জিত হয়ে তিনি মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেবীর হাতে পরাজিত হয় মহিষাসুর। প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য ও ন্যায়ের বিজয়, অবসান ঘটে অশুভ শক্তির দাপটের।

দেবী দুর্গার এই পৌরাণিক কাহিনি শুধু অসুরবিনাশের আখ্যান নয়; এর মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা। মহিষাসুর অহংকার, অন্যায় ও অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীক। অন্যদিকে, দেবী দুর্গা সাহস, ন্যায়, শক্তি ও শুভবোধের প্রতীক। তাঁর আগমনী বার্তা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায় এবং মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর সম্ভাবনা কখনো নিঃশেষ হয় না।

আশ্বিনের শারদপ্রাতে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠে মাঠে কাশফুলের দোলা, শিউলির স্নিগ্ধ সুবাস আর শিশিরভেজা ঘাসের ওপর জমে থাকা জলবিন্দু শরতের সৌন্দর্যকে করে তোলে অনন্য। নদীর কলতান, পাখির কূজন এবং দূরাগত ঢাকের অনুরণনে জেগে ওঠে বাঙালির চিরচেনা উৎসবপ্রাণ।

বাংলার প্রচলিত বিশ্বাসে এ সময় দেবী দুর্গা সন্তান-সন্ততিসহ কৈলাস থেকে মর্ত্যে আগমন করেন। ভক্তদের কল্পনায় দেবীর আগমন যেন শুধু একটি ধর্মীয় ঘটনার প্রকাশ নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে সাহস, মমতা ও আশার পুনর্জাগরণ। ঘরে ঘরে, মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় পূজার প্রস্তুতি। প্রতিমাশিল্পীর নিপুণ হাতে খড়ের কাঠামো ও মাটির প্রলেপে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মাতৃশক্তির প্রতীকী রূপ।

মহালয়ার কথা উঠলেই বাঙালির স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ভোরের নিস্তব্ধতা আর বেতারযন্ত্র থেকে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠের গম্ভীর ধ্বনি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র, গান ও আবৃত্তির সমন্বয়ে পরিবেশিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

বাণীকুমারের রচনা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনা এবং বিভিন্ন শিল্পীর সম্মিলিত পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মহালয়ার ভোরকে এক অনন্য আবেগে রাঙিয়ে রেখেছে। ১৯৩০-এর দশক থেকে বেতারে প্রচারিত এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে বাঙালির শারদীয় অনুভূতি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।

ভোরের অন্ধকারে যখন চারপাশ থাকে নিস্তব্ধ, তখন চণ্ডীপাঠের মন্ত্রমুগ্ধ আবহ যেন ঘুমন্ত প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলে। পরিবারের প্রবীণ সদস্য থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই অনুষ্ঠান শুনে মহালয়ার আবহ অনুভব করেন। সময়ের পরিবর্তনে বেতারের পাশাপাশি টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে এই ঐতিহ্য। তবু মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের আবেদন আজও অমলিন।

মহালয়া এবং দুর্গাপূজা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হলেও দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। মহালয়া মূলত পিতৃপক্ষের শেষ তিথি এবং পূর্বপুরুষদের স্মরণে নিবেদিত একটি বিশেষ দিন। অন্যদিকে, দেবীপক্ষের সূচনা শারদীয় মাতৃআরাধনার আগমনী আবহকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

প্রচলিত বাঙালি সংস্কৃতিতে মহালয়ার সাত দিন পর দুর্গাপূজার মূল উৎসবপর্ব শুরু হওয়ার ধারণাটি বহুল পরিচিত। তবে তিথি, পূজাপঞ্জিকা ও আঞ্চলিক প্রথা অনুসারে দেবীর বোধন, কল্পারম্ভ এবং পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনায় পার্থক্য দেখা যায়। তাই মহালয়াকে দুর্গাপূজার মূল পূজারম্ভ হিসেবে বিবেচনা না করে শারদীয় মাতৃআরাধনার আবেগময় সূচনা হিসেবে দেখা অধিক যথাযথ।

মহালয়াকে ঘিরে প্রতিমাশিল্পের জগতেও তৈরি হয় বিশেষ আবহ। কুমোরের চাকার ঘূর্ণন, মাটির গন্ধ, খড়ের কাঠামো এবং শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায় দেবী দুর্গার প্রতিমা। দেবীর মুখাবয়বে ফুটে ওঠে মাতৃত্ব, শক্তি, করুণা ও বিজয়ের প্রতীকী অভিব্যক্তি।

অনেক জায়গায় মহালয়াকে ঘিরে প্রতিমার চক্ষুদানের ঐতিহ্যও পালিত হয়। যদিও এই রীতি সব অঞ্চলে এক নয়, তবু ভক্তদের কাছে এর আবেগময় তাৎপর্য রয়েছে। প্রতিমার চোখ আঁকার মধ্য দিয়ে যেন শিল্পীর তুলিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে মাতৃমূর্তি, আর ভক্তদের হৃদয়ে জেগে ওঠে নতুন প্রত্যাশা।

এদিকে পূজার আগমনী পর্বে মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, প্রতিমা সাজানো, পূজার উপকরণ সংগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ক্রমশ এগিয়ে চলে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি, ধূপের সুগন্ধ আর আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপের স্বপ্ন মানুষের মনে তৈরি করে উৎসবের অনন্য আবেশ। শিশু-কিশোরদের নতুন পোশাকের আনন্দ, পরিবারের সদস্যদের মিলন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রত্যাশা এবং দূরে থাকা স্বজনদের ঘরে ফেরার আকুলতা সব মিলিয়ে মহালয়া হয়ে ওঠে অপেক্ষার এক বিশেষ নাম।

মহালয়ার তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি, সংযম, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও শুভচিন্তার চর্চা। দেবীর কাছে ভক্তরা প্রার্থনা করেন পরিবার-পরিজনের মঙ্গল, সমাজের শান্তি এবং মানুষের জীবনে দুঃখ-দুর্দশা অতিক্রম করার শক্তি।

বাংলার উৎসব-ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও দুর্গোৎসবকে ঘিরে শুভেচ্ছা বিনিময়, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বহু জায়গায় সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজেও এ উৎসব শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মূল্যবোধকে সামনে আনার সুযোগ সৃষ্টি করে।

দেবী দুর্গার আরাধনার প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের আচরণে প্রতিফলিত হয় সত্য, ন্যায়, দয়া ও পরস্পরের প্রতি সম্মান। অশুভের বিনাশ এবং শুভের প্রতিষ্ঠার পৌরাণিক বার্তা অন্যায়, হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক প্রেরণা জোগায়।

মহালয়ার এই প্রভাতে তাই মানুষের প্রার্থনা অন্তর থেকে দূর হোক অন্ধকার, সমাজ থেকে মুছে যাক বিদ্বেষের কালিমা, আর সম্প্রীতির বন্ধনে আরও দৃঢ় হোক মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। যে মাতৃশক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক, তাঁর বন্দনায় জেগে উঠুক ন্যায় প্রতিষ্ঠার সাহস। যে মহামায়া মমতা ও শক্তির সম্মিলিত রূপ, তাঁর আগমনী বার্তা মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলুক মানবিকতার দীপশিখা।

আজ পিতৃপক্ষের স্মৃতিময় অবসান পেরিয়ে শুরু দেবীপক্ষের নতুন অধ্যায়। পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, চণ্ডীপাঠের পবিত্র ধ্বনি, শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোলা ও আগমনী গানের সুরে রঙিন হয়ে উঠছে বাঙালির মন। দেবী দুর্গাকে ঘিরে মানুষের হৃদয়ে জেগে উঠছে নতুন আশার আলো। অপেক্ষার প্রহর গুনছে ভক্তরা কবে ঢাকের বাদ্য আরও জোরে বাজবে, কবে মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলবে আলোর মালা, আর কবে ভক্তের অর্ঘ্যে সজ্জিত হবে মাতৃমূর্তি।

অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, বর্তমানের প্রতি দায়িত্ব এবং আগামীর প্রতি আশাবাদ এই তিনের সম্মিলনেই মহালয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য। তাই আজকের প্রার্থনা, অশুভের বিনাশ হোক, শুভশক্তির জয় হোক, মানুষের হৃদয়ে জাগুক প্রেম, শান্তি ও সহমর্মিতা। দেবী দুর্গার আগমনী সুরে মুখরিত হোক বাংলার আকাশ-বাতাস; আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির আলোয় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি ঘর, প্রতিটি হৃদয়।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর