শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ন

সিলেটে ৬৩৭ মণ্ডপে আয়োজন

আজ মহাষষ্ঠী: বোধনের সুরে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব

জনি কান্ত শর্মা

প্রকাশিত: ১৬/১০/২০২৬ ১১:৪৮:২৮ পূর্বাহ্ন

আজ মহাষষ্ঠী: বোধনের সুরে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব


শরতের সাদা মেঘ, শিউলির সুবাস আর ঢাকের ছন্দে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। আজ মহাষষ্ঠী। দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ হয়েছে প্রস্তুতির কাজ। আলোকসজ্জা, প্রতিমার সাজসজ্জা আর ভক্তদের অপেক্ষায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জনপদ।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬৩৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪৭৪টি মণ্ডপ রয়েছে। এসবের মধ্যে সর্বজনীন ৪৪৮টি এবং পারিবারিক মণ্ডপ ২৬টি। অন্যদিকে, সিলেট মহানগরে ১৬৩টি মণ্ডপে পূজা হবে। এর মধ্যে সর্বজনীন ১৪৭টি এবং পারিবারিক মণ্ডপ ১৬টি।

মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হলেও মহাষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সন্ধ্যায় বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে মণ্ডপে দেবীর অধিষ্ঠান হবে। এরপর মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমীতে পূজা-অর্চনা, আরতি, অঞ্জলি ও নানা ধর্মীয় আচার পালিত হবে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের মূল আয়োজন।

সনাতন ধর্মশাস্ত্রে দেবী দুর্গাকে দুর্গতি থেকে মুক্তিদানকারী, বিপদনাশিনী ও অশুভ শক্তির বিনাশকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ‘দুর্গা’ নামের প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রু বিনাশের তাৎপর্য যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ যিনি মানুষকে বিভিন্ন বিপদ, ভয় ও অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করেন, তিনিই দেবী দুর্গা।

দেবী দুর্গা বিভিন্ন নামে ও রূপে পূজিত হন। মহিষমর্দিনী, শূলিনী, পার্বতী, কালিকা, ভারতী, অম্বিকা, গিরিজা, বৈষ্ণবী, কৌমারী, চণ্ডী, লক্ষ্মী, উমা, হৈমবতী, কমলা, শিবাণী ও যোগনিদ্রা তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

শ্রীচণ্ডী অনুসারে, দুর্গা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি। পৌরাণিক বর্ণনায়, বিভিন্ন দেবতার তেজ থেকে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সৃষ্টি হয়।

শুধু তাই নয়, দেবতারা দেবীকে বিভিন্ন অস্ত্র ও উপহার দিয়ে সজ্জিত করেন। মহাদেব দেন ত্রিশূল, বিষ্ণু চক্র, বরুণ শঙ্খ, অগ্নি শক্তি, বায়ু ধনুক ও বাণপূর্ণ তূণীর এবং ইন্দ্র বজ্র। যম দেন কালদণ্ড, ব্রহ্মা অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, বিশ্বকর্মা বিভিন্ন অস্ত্র ও অভেদ্য কবচ এবং হিমালয় দেন সিংহ। অন্য দেবতারাও তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেবীকে অস্ত্র, অলংকার ও অন্যান্য উপহার দেন। এই পৌরাণিক বর্ণনায় দেবী দুর্গা সম্মিলিত শক্তি, সাহস ও অশুভ বিনাশের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

দেবীর সঙ্গে পূজিত হন বিদ্যা ও জ্ঞানের প্রতীক সরস্বতী, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী, সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং শক্তি ও বীর্যের প্রতীক কার্তিক। তাঁদের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন ত্যাগ ও বৈরাগ্যের প্রতীক দেবাদিদেব মহাদেব। ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে শক্তি, জ্ঞান, ঐশ্বর্য, সিদ্ধি, সাহস ও বৈরাগ্যের সম্মিলিত তাৎপর্য প্রকাশ পায়।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, দুর্গাপূজার প্রাচীন প্রচলিত সময় বসন্তকাল। চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত এই পূজা বাসন্তীপূজা নামে পরিচিত। 

পুরাণ ও ধর্মীয় আখ্যান অনুযায়ী, রাবণকে পরাজিত করার আগে রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। সীতাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য তিনি দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। প্রচলিত বিশ্বাসে, এই শরৎকালীন পূজার মধ্য দিয়েই শারদীয় দুর্গোৎসবের বিশেষ তাৎপর্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

কালিকাপুরাণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আখ্যানেও রামচন্দ্রের বোধন ও দুর্গাপূজার উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, দেবীর আশীর্বাদ লাভের মধ্য দিয়ে রামচন্দ্র রাবণবধের শক্তি অর্জন করেন। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শরৎকালের দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।

শারদীয় দুর্গাপূজা তাই শুধু দেবীর আরাধনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পৌরাণিক কাহিনি, শাস্ত্রীয় আচার, ঐতিহাসিক বিশ্বাস এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

প্রচলিত শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দেবীর আগমন ঘোড়ায়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ঘোড়ায় আগমনকে সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিরতা, সংঘাত কিংবা সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। তবে ভক্তদের প্রত্যাশা, দেবীর আশীর্বাদে পৃথিবী থেকে অশান্তি দূর হবে এবং মানুষের জীবনে ফিরে আসবে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ।

দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। নতুন পোশাক, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো এবং আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উৎসবের দিনগুলো কাটান অনেকে। বিভিন্ন ধর্ম ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণে পূজা পরিণত হয় সামাজিক মিলনমেলায়।

দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে শুভের জয়, ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার বার্তাও তুলে ধরা হয়। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মানুষের কল্যাণ কামনায় ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন।

এদিকে, দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সিলেটে প্রস্তুতি নিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ। জেলা ও মহানগর শাখার বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে ১৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই শাখার যৌথ উদ্যোগে গঠন করা হয়েছে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং সেল।

পূজামণ্ডপগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়ের জন্য এই সেল কাজ করবে। পূজা কমিটিগুলোকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, সবার সচেতনতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় উৎসবের দিনগুলো নির্বিঘ্নে কাটবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে সবাই উৎসব উদযাপন করবেন বলেও আশা তাঁদের।

চলতি বছরের সূচি অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। ১৭ অক্টোবর শনিবার মহাসপ্তমী, ১৮ অক্টোবর রবিবার মহাঅষ্টমী, ১৯ অক্টোবর সোমবার মহানবমী এবং ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার বিজয়া দশমী পালিত হবে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আয়োজন।

মহাষষ্ঠীর বোধনে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর আরাধনার পাশাপাশি ভক্তদের প্রত্যাশা, এবারের উৎসব বয়ে আনবে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের বার্তা। শরতের স্নিগ্ধ আবহে ঢাকের তালে, প্রার্থনার সুরে এবং মিলনের আনন্দে পূর্ণ হয়ে উঠুক সিলেটসহ সারা দেশের জনপদ।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর