মাত্র ১৮ বছর বয়সে দলই সীমান্তে সম্মুখযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব দেখিয়ে শহীদ হন মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান। তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতি আজও বহন করছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের দলই সীমান্ত।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দলই সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙ্কারে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ফেরার পথে শত্রুপক্ষের গুলিতে শহীদ হন তিনি।
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামের সন্তান হামিদুর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দলই রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ দেওয়া হয়। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে কমলগঞ্জের দলই সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র লড়াই চলছিল। চারপাশে চা-বাগানঘেরা ওই এলাকায় ছিল ধলাই সীমান্ত চৌকি। এর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে মুক্তিবাহিনীর সাবসেক্টর ক্যাম্প অবস্থিত ছিল।
প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির সদস্য হিসেবে দলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলের অভিযানে যোগ দেন হামিদুর রহমান।
সব প্রস্তুতি শেষে ২৮ অক্টোবর ভোররাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে চারদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালান। ব্যাপক গোলাবর্ষণে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। শত্রুপক্ষের অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় একটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। এরপর পাকিস্তানি সেনাদের মেশিনগানের তীব্র গুলির মুখে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।
এ পরিস্থিতিতে মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই দায়িত্ব দেওয়া হয় সিপাহি হামিদুর রহমানকে।
পাহাড়ি খাল দিয়ে বুক ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে তিনি মেশিনগান পোস্ট লক্ষ্য করে দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। গ্রেনেড দুটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এরপর গুলিবিদ্ধ হয়েও থেমে যাননি তিনি। মেশিনগান পোস্টে পৌঁছে দুই পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে হাতাহাতি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে পোস্টটি অকার্যকর করে দিতে সক্ষম হন।
হামিদুর রহমানের এই পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা দলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। তবে সেই বিজয় দেখে যেতে পারেননি হামিদুর রহমান। ফাঁড়ি দখলের পর সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।
শহীদ হামিদুর রহমানকে সীমান্তের অল্প দূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের একটি পরিবারের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর দলই সীমান্ত ফাঁড়িতে তৎকালীন বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি, স্থানীয়ভাবে একটি নামফলকসদৃশ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করে। ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান দলই সীমান্ত এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের লিখিত আবেদন ও এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্তে তাঁর দেহাবশেষ গ্রহণ করে। পরে যথাযথ মর্যাদায় কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে তা বাংলাদেশে আনা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে।
প্রতি বছরের মতো এবারও শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বিজিবি ব্যাটালিয়ন কমান্ড ও কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে দলই সীমান্তে অবস্থিত হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানোর কথা রয়েছে।
দেশের স্বাধীনতার জন্য মাত্র ১৮ বছর বয়সে প্রাণ উৎসর্গ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি 








