পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়তে ভবন নির্মাণের প্রতিটি ধাপে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে চায় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিউক)। অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা, বিধিমালা লঙ্ঘন, প্রয়োজনীয় খালি জায়গা না রাখা কিংবা পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না করার মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে এবার সরেজমিনে তৎপরতা বাড়িয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবনের বেইজমেন্ট ও নিচতলায় জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সড়কে নির্মাণসামগ্রী রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার বিষয়েও দেওয়া হচ্ছে নির্দেশনা। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ করলে মিলবে না কমপ্লিশন ও অকুপেন্সি সার্টিফিকেট।
বৃহস্পতিবার নগরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন বহুতল ভবন পরিদর্শনকালে সিউকের কঠোর অবস্থানের কথা জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদা) রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি জানান, ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতি সপ্তাহে নগরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করা হবে।
সিউক চেয়ারম্যান বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক থেকে দুই দিন নগরের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনগুলো পরিদর্শন করা হচ্ছে। ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, নির্ধারিত সেটব্যাক ও উচ্চতা ঠিক রাখা হয়েছে কি না এবং ভবনের সামনের প্রয়োজনীয় জায়গা ছাড়া হয়েছে কি না, তা সরেজমিনে যাচাই করা হচ্ছে।
সিউক সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার খাদিমপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকতে দেখা যায়। এতে সেখানে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিষয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে আগামী রোববারের মধ্যে নিজ দায়িত্বে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলার জন্য ভবন কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ দেন সিউক চেয়ারম্যান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পানি অপসারণ করা না হলে পুনরায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
নগরের অন্যান্য নির্মাণাধীন ভবনেও এ ধরনের অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেন কয়েস লোদী। বেইজমেন্টে পানি জমতে না দেওয়া এবং এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে ভবনমালিকদের নিজেদের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সড়কের ওপর যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী না রাখার অনুরোধ করেন।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মালিকের পাশাপাশি প্রকৌশলী ও কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সিউক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রকৌশলীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ভবনের কমপ্লিশন সার্টিফিকেট এবং পরবর্তী সময়ে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের ভিত্তিতেই ভবনে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ নেওয়া হয়।
পরিদর্শনে কয়েকটি ভবনে তদারকির ঘাটতি পাওয়ার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেক ভবনমালিক নির্মাণকাজের কারিগরি বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। আবার কোথাও কোথাও প্রকৌশলীদের যথাযথ তত্ত্বাবধান ছাড়াই ঠিকাদারেরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বহুতল ভবন নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এ ধরনের প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কয়েস লোদী আরও বলেন, একটি ভবন কেবল বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য সিলেট গড়ে তুলতে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও প্রচলিত আইন মেনে চলা জরুরি। নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করা হলে ফুটপাত ও ভবনের সামনের প্রয়োজনীয় জায়গা উন্মুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে ভবনের ভেতরে পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে সড়কে অবৈধ পার্কিংয়ের চাপ কমবে এবং নগরের চলাচলব্যবস্থা আরও স্বাভাবিক হবে।
নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করে সিউক চেয়ারম্যান বলেন, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলা শুধু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একার দায়িত্ব নয়। এ জন্য প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সিউকের চলমান উদ্যোগে নগরবাসী ইতিবাচক সাড়া দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরিদর্শনকালে সিউকের নির্বাহী পরিচালক (সিনিয়র সহকারী সচিব ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট) মো. সাদিউর রহিম জাদিদসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









