পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশ। প্রযুক্তি, আধুনিক অবকাঠামো আর ডিজিটাল সেবার সমন্বয়ে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। সেই পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ চীন। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চীনের আধুনিক বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে ঢাকার বিমানবন্দরে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেছেন সাহেদ আহমেদ নামে এক ব্যবহারকারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থার তুলনা করে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তাঁর লেখার শিরোনাম, ‘চীন ২০৮০ সালে, আর আমরা কি এখনো ১৯৮০ সালেই পড়ে আছি?’ একই সঙ্গে দেশের বিমানবন্দর আধুনিকায়ন, যাত্রী হয়রানি বন্ধ এবং প্রবাসীদের জন্য সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সাহেদ আহমেদ জানান, চীন সফরের শুরুটা ছিল আনন্দের। ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভ্রমণের পরিকল্পনা শেষে তিনি সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও তেমন কোনো জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়নি। সবকিছু সহজ মনে হওয়ায় তাঁর ধারণা হয়েছিল, বাংলাদেশ হয়তো আন্তর্জাতিক সেবার মানের দিক থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই।
তবে চীনের ইমিগ্রেশন নিয়ে মনে কিছুটা শঙ্কা ছিল তাঁর। সেখানে গিয়ে কী ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, তা নিয়ে একধরনের আশঙ্কাও কাজ করছিল। কিন্তু চীনে পৌঁছানোর পর তাঁর সেই ধারণা বদলে যায়। বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর কার্যক্রম, আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দ্রুতগতির ডিজিটাল সেবা তাঁকে বিস্মিত করে।
চীনের গুয়াংজুতে ক্যান্টন ফেয়ারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, দেশটির অবকাঠামো, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও উন্নয়ন তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, চীন যেন ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে। কোথাও কোথাও বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়নের ব্যবধানকে তাঁর কাছে প্রায় একশ বছরের ব্যবধান বলেও মনে হয়েছে।
চীন সফর শেষে কেনাকাটা করে দেশে ফেরার সময়ও বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থা তাঁকে মুগ্ধ করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে নির্ধারিত সময়ে বিমানে ওঠেন তিনি। এরপর ঢাকায় ফিরে আসেন।
কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পরই তাঁর অভিজ্ঞতায় আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে ভালো লাগার অনুভূতির পাশাপাশি বিমানবন্দরের কিছু সেবা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়। ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত শেষ হওয়ায় প্রথমে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু লাগেজ সংগ্রহ ও স্ক্যানিংয়ের পর্যায়ে গিয়ে সেই সন্তুষ্টি আর থাকেনি।
সাহেদ আহমেদের দাবি, লাগেজের জন্য তাঁকে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এরপর ট্রলিতে ব্যাগ নিয়ে স্ক্যানিংয়ের লাইনে দাঁড়ালে আরও প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় দুইজনের ব্যাগ পরীক্ষা করার পর তাঁকে অন্য একটি স্থানে যেতে বলা হয়।
সেখানে গিয়ে আবারও প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। পরে নিজের হাতে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ব্যাগ পরীক্ষা করা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষা ও তল্লাশির পরও ব্যাগে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
এ অভিজ্ঞতার পর প্রশ্ন তুলে সাহেদ আহমেদ জানতে চান, বিমানবন্দরে যাত্রীদের এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখার প্রয়োজন কী? প্রযুক্তির এত উন্নতির যুগে কেন লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা পরীক্ষায় এত দীর্ঘসূত্রতা থাকবে?
তিনি লেখেন, গত ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে বিদেশে যাতায়াত করছেন। কিন্তু এত বছরেও বাংলাদেশের বিমানবন্দরের স্ক্যানিং ও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান আধুনিক পরিবর্তন তাঁর চোখে পড়েনি। বিশেষ করে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের শ্রম ও দেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বিমানবন্দরে তাঁদের এমন ভোগান্তির মুখোমুখি হওয়াকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন তিনি।
লেখায় সরকারের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন ও দাবি তুলে ধরেছেন সাহেদ আহমেদ। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্ক্যানিং ব্যবস্থা আধুনিক ও এআইনির্ভর করা, লাগেজ সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় ব্যাগ তল্লাশি ও যাত্রী হয়রানি বন্ধ এবং প্রবাসীদের জন্য দ্রুত ও সম্মানজনক সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সাহেদ আহমেদ বলেন, তাঁরা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; চান আন্তর্জাতিক মানের সেবা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সম্মানের সঙ্গে দেশে প্রবেশের অধিকার। তাঁর মতে, চীনের উন্নয়ন প্রমাণ করে পরিকল্পনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও সদিচ্ছা থাকলে একটি দেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশেরও সেই সক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।
নিজের লেখার শেষাংশে দেশপ্রেমের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাঁরা চীন হতে চান না, বরং নিজেদের বাংলাদেশকেই আধুনিক ও উন্নত দেখতে চান। মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা রেখেই বিমানবন্দরসহ দেশের প্রতিটি সেবাখাতকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা তাঁর।
সরকারের প্রতি বিমানবন্দর আধুনিকায়ন, প্রবাসী হয়রানি বন্ধ এবং যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘পরিবর্তন চাই, বাস্তব পরিবর্তন চাই।’
চীনের উন্নত প্রযুক্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে দেশে ফিরে বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতায় হতাশ হওয়া সাহেদ আহমেদের এই বক্তব্য আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবার মানে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো কবে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে?
আজকের সিলেট/ জেকেএস









