মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী : দেশের প্রবীণ বুজুর্গ আলেম আলহাজ্ব হজরত মাওলানা আবুল বাশার পীরছাহেব শাহতলী রহ. অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় সক্রিয় ভ‚মিকায় থেকে আধ্যাত্মিক ময়দানে কাজ করে যান। এ যাবৎ তিনি অর্ধশত জনকে খেলাফত দিয়েছেন। দেশ-বিদেশে তার কয়েক লাখ মুরিদ রয়েছেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায় মসজিদ-মাদ্রাসা এবং খানকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বীনি কার্যক্রমের সঙ্গে অন্তত লক্ষাধিক মুরিদ ও ভক্ত রয়েছে।
পৈতৃক নিবাস
ফরিদপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ভুমখাড়া গ্রামে তার পৈতৃক নিবাস। পরবর্তী সময়ে তিনি চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী শাহতলী গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পিতা আব্দুল কাদের (রহ.), মাতা সৈয়দা হালিমা খাতুন। তিনি (ঢাকার-১২১৫) তেজগাঁও শিল্প এলাকার ২২৮/সি পূর্ব নাখালপড়ায় নিজস্ব বাসায় ‘খানকায়ে শায়খ জাকারিয়া’তে বসবাস করতেন। এ ছাড়া গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে খানকায়ে বাশারিয়া, খানকায়ে ইমদাদিয়া কাওলার (দক্ষিণখান, ঢাকা), চাঁদপুর, চট্টগ্রামেও তিনি মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
প্রচারবিমুখ এই আধ্যাত্মিক সাধকের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ১৯৩৭ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি জন্ম। প্রকৃতপক্ষে বয়স আরও বেশি। শতবর্ষী এই বুযুর্গ আলেম নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই বলেন, ‘শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার অন্তর্গত ভ‚মখাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। উজানীর হজরত (কারি ইবরাহিম রহ.) সফরে গেলে তার পিতা ও বড় চাচা কারি মো. হানিফকে উজানী মাদ্রাসায় ভর্তি করান। লেখাপড়া শেষে কচুয়া বাজারে ২ জনকে ২টি দোকান করে দিলে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার ক্বারী (ইবরাহিম) সাহেব (রহ.) বসতেন। ক্বারী সাহেব তাঁকে কোলে করে পাঁচ পুকুড়িয়া (উজানী) নিয়ে যেতেন। চরমোনাইর (হজরত ইসহাক রহ.) হুজুরের নির্দেশে তরিকার খেদমতের জন্য শাহতলীতে বাড়ি, মাদ্রাসা ও খানকা নির্মাণ করি। শরীয়তপুর জেলার খাটহুগলী গ্রাম আমার নানা বাড়ি।’
পীরছাহেব শাহতলীর নানার নাম সৈয়দ রজব আলী, দাদার নাম তমিজ উদ্দিন ঢালী। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। শাহতলী থেকে ৩ মাইল দূরে শ্রীপুর মজুমদার বাড়ি নিবাসী আব্দুস সামাদ মজুমদারের সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা সৈয়দা মুহসিনা খাতুনের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি ৬ ছেলে ৫ মেয়ের জনক ছিলেন। সন্তানগণ হলেন: ১. মাওলানা হোসাইন আহমদ হেলাল, ২. মৌ: সাব্বির আহমদ শরীফ ৩. মাসুম বিল্লাহ ৪. যুবায়ের আহমদ ৫.মাওলানা জাফর আহমাদ ৬. মাওলানা তোফায়েল আহমদ।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, উপমহাদেশের শ্রেষ্টতম বুজুর্গ আমার শায়েখ ও মুর্শিদ শাহতলী রহ: ছিলেন আল্লামা আব্দুল হাফিজ মক্কী রহ: এবং চরমোনাই মরহুম পীর সৈয়দ ইসহাক রহ: এর প্রধান খলিফা ছিলেন।
পীরে তরিকত মাওলানা আবুল বাশার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় সক্রিয় ভ‚মিকায় থেকে আধ্যাত্মিক ময়দানে কাজ করে যান। এ যাবৎ তিনি অর্ধশত জনকে খেলাফত দিয়েছেন। দেশ-বিদেশে তার কয়েক লাখ মুরিদ রয়েছেন।
খোলাফা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত
গত ২০ মার্চ ২০২৫ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় শাহতলীতে পীরছাহেব হুজুরের খাসকামরায় খলিফা ও পারিবারিক সদস্য, স্বজনদের এক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদের শিক্ষক ও পীরছাহেবের বড়জামাতা মাওলানা শামসুল হক।
উপস্থিত ছিলেন- পীরছাহেব (র) এর একমাত্র ছোট ভাই ক্বারী মৌ. আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব, বড় ছাহেবযাদা মাওলানা হোসাইন আহমদ হেলাল, দ্বিতীয় ছেলে মৌ: শাব্বীর আহমদ শরীফ, চতুর্থ ছাহেবযাদা যুবায়ের আহমদ, খলিফা ও ছাহেবযাদা মাওলানা জাফর আহমাদ, ছোট ছাহেবযাদা মাওলানা তোফায়েল আহমদ, পীরছাহেব হুজুরের ভাগ্না মাওলানা মুশতাক আহমদ শরীয়তপুরী খলিফাদের মধ্যে মাওলানা আজিজুর রহমান বুলবুলী, মাওলানা শফিকুর রহমান মিতুল্লাহ, মাওলানা রুহুল আমীন নগরী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারাবী, প্রফেসর আবু তালেব, মৌ: লিয়াকত আলী, আলহাজ্ব মো: জাহাঙ্গীর আলম, আবু আল ফয়সাল, মাওলানা মুনিরুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল্লাহ আস সাবেরী, মাওলানা আব্দুর রহিম, মো: শিহাব উদ্দিন, মো: নাজমুল হক, আব্দুস সালাম, মাওলানা আবরারুল হক, মাওলানা সাইফুল্লাহ জাফরী প্রমুখ।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত হয়
১. বেলা ২ টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
জানাজায় ইমামতি করবেন মাওলানা জাফর আহমাদ শাহতলী।
২. পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলবেন মাওলানা হোসাইন আহমদ হেলাল, বড় জামাতা মাওলানা শামসুল হক, খলিফাদের পক্ষ থেকে যথাক্রমে মাওলানা আজিজুর রহমান বুলবুলী, মাওলানা শফিকুর রহমান মিতুল্লা, মাওলানা রুহুল আমীন নগরী।
৩. শাহতলীর বার্ষিক মাহফিলের তারিখ ১, ২ ও ৩ রা জানুয়ারি ২০২৬ ঈসায়ী নির্ধারণ করা হয়।
৪. ইছলাহুল মুসলিমীন বাংলাদেশের আমির, শাহতলী দরবার ও তরিকার সার্বিক পরিচালনার জন্য মাওলানা জাফর আহমাদ সাহেবকে স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করা।
৫. আগামী ১৯ এপ্রিল ২০২৫ খলিফাগণের জরুরী বৈঠক গাজীপুরের হালডোবা মাদরাসায় আহবান করা হয়।
এ’তেকাফ
মক্কাতুল মুকাররমা, মদীনাতুল মুনাওয়ারায় অনেকবার এতেকাফ করেছেন। হজ্ব-ওমরা করেছেন অন্তত ৫৮ বার। ১৯৯৭ সনে ফিদায়ে মিল্লাত আল্লামা সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) ঢাকার চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা মসজিদে পবিত্র মাহে-রমাদানে মাসব্যাপী এ’তেকাফ করেছিলেন। উক্ত এ’তেকাফে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমগণ উপস্থিত ছিলেন। পীরছাহেব শাহতলী রহ. ও ছিলেন। ফিদায়ে মিল্লাত কে এতটাই মুহাব্বত করতেন যে, তিনি নিজ বাসা থেকে ইফতার তৈরি করে হযরতের জন্য নিতেন। লাইলাতুল কদরে হযরতের সাথে তাহাজ্জুদ নামাজ একসাথে আদায় করে একই দস্তারখানে সাহরী খেয়েছেন! মাদানী খানদানের কোন আলেম বাংলাদেশে আসলে তিনি সেখানেই ছুটে যেতেন।
শেষ বয়সে এসেও যখনই শুনতেন সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী ও সাইয়্যিদ আসজাদ মাদানী সাহেব বাংলাদেশে এসেছেন, নিজ প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে উনাদের সাক্ষাতে চলে যেতেন।
খেলাফত প্রাপ্তি
তিনি চরমোনাইয়ের মরহুম (প্রথম) পীর মাওলানা শাহ সৈয়দ ইসহাক (রহ.)-এর খলিফা। এ ছাড়া দেওবন্দি সিলসিলার প্রখ্যাত বুজুর্গ শায়খুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)-এর খলিফা মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী (রহ.)-এর কাছ থেকেও খেলাফতপ্রাপ্ত হন। তার ইন্তেকালের পরে আমিরুল হিন্দ সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানির সঙ্গে ইসলাহি সম্পর্ক কায়েম করেন। অপরদিকে পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম মাওলানা শেখ ইদ্রিস জিলানী (রহ.)-এর কাছ থেকে ইজাজত ও খেলাফতপ্রাপ্ত হন।
পীরছাহেব শাহতলীর নানার নাম সৈয়দ রজব আলী, দাদার নাম তমিজ উদ্দিন ঢালী। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়।
শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারান। পরে চাচার মাধ্যমে তিনি শাহতলী আলিয়ায় ভর্তি হন। তখন ছোট্ট বালক আবুল বাশারের লজিং হয় শাহতলী আলিয়ার শিক্ষক ক্বারী মাওলানা ইমাম উদ্দিনের ঘরে। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। পিতা-মাতাহীন শিশু আবুল বাশারকে লালন-পালন করে মানুষ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান হলো কারী ইমাম উদ্দিন ও তদীয় স্ত্রী আছিয়া খাতুনের। তারা তাকে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সমুদয় সম্পত্তি পালকপুত্র আবুল বাশার (পীরছাহেব শাহতলী)-এর নামে লিখে দিয়ে যান। এমনকি পীরছাহেবের ১১ সন্তানকেও লালন-পালন করেন আছিয়া খাতুন।
কচুয়া থানার উজানী মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি, পরে মনপুরা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর শাহতলী ও ঢাকা আলিয়া থেকে ফাযিল ও কামেল পাস করেন। শাহতলী আলিয়ার পরে চাঁদপুর চিশতিয়া কলেজে ১ বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর ঢাকা আলিয়ায় ভর্তি হয়ে ফিকাহ শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন।
ঢাকা আলিয়ায় পড়াশোনা শেষে স্বীয় মুর্শিদ শাহ সৈয়দ ইসহাক (রহ.)-এর পরামর্শে ভারতের বিখ্যাত মাদ্রাসা দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে আরেক বছর দাওরায়ে হাদিসে পড়াশোনা করেন।
তখনকার মুহতামিম ছিলেন কারী তৈয়ব (রহ.)। পীর ছাহেব শাহতলী ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। জীবনে কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হননি।
শাহতলী আলিয়ার শিক্ষকমন্ডলী
খলিফায়ে মাদানী মাওলানা দেলোওয়ার হোসাইন যেনুয়ারী (তৎতাসীন শাহতলী আলিয়া মাদ্রাসায় শায়খুল হাদীস পদে ছিলেন। মাওলানা আব্দুল লতিফ সাহেব (রহ.)। মাওলানা আব্দুল ওয়াহিদ সাহের (রহ) (প্রিন্সিপাল তৎকালীন শাহতলীর) আশেকে মাদানী মাওলানা আব্দুল হাই সাহেব (রহ.) মাওলানা নুরুল ইসলাম সাহেব (রহ.) প্রমুখ। ঢাকা আলিয়ার উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা যফর আহমদ উসমানী (রহ.) (তিনি ছিলেন মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর(রহ) আপন ভাগিনা), মুফতী আমিমুল এহসান মুজাদ্দেদী প্রমুখ।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অধিকারী তিনি, অনেক ঘটনার সাক্ষী। ১৯৮০ সালের মার্চ মাসে দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পীর সাহেব শাহতলী, মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়ার লিখিত পত্র নিয়ে মাওলানা শামছুদ্দীন কাসেমি (রহ.)-এর সঙ্গে তখন ভারত সফর করেন।
লিখনী ও ভাষাগত দক্ষতা
পীর সাহেব শাহতলী বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের উপর অতান্ত পারদর্শী ছিলেন। বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিশুদ্ধ আরবি, উর্দু, আদিও ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষাতেও রয়েছে তার সমান দক্ষতা ছিলো।
সুন্দর হস্তলিপিতে খুব পারদর্শী। এটি ছিল তার বিশেষ একটি গুণ। কর্মজীবনে তিনি চরমোনাইয়ের মরহুম পীর মাওলানা সৈয়দ ইসহাক (রহ.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত মাসিক জেহাদে ইসলামের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটি ৪-৫ বছর নিয়মিত প্রকাশিত হয়। বাগে জান্নাত, পর্দা পাঠকপ্রিয় দুটি বই।
রাজনীতি
জীবনের লম্বা একটা সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। উপমহাদেশের শীর্ষ উলামা-মাশায়েখদের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। জমিয়তের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে খুব মহব্বত করতেন। তিনিই আমাকে জমিয়তের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন।’
১৯৮৮ সালের ২৮ মার্চ মিরপুরের আরজাবাদ মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কাউন্সিলে মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (রহ.) সভাপতি এবং মাওলানা শামছুদ্দীন কাসেমি (রহ.) মহাসচিব নির্বাচিত হন। ওই কমিটিতে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন পীর সাহেব শাহতলী। এরপর আরও কয়েকবার তিনি একই দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের কাউন্সিলে শাহতলীর পীর সাহেবকে জমিয়তের পৃষ্ঠপোষক বানানো হয়।
নব্বইয়ের দশকে তিনি দ্বীনি সফরে লন্ডনে যান। সেখানেও ইউরোপ জমিয়তের বিভিন্ন প্রোগ্রামে দাওয়াতি মেহমান হয়ে অংশগ্রহণ করেন। এসব প্রোগ্রামে ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানি (রহ.) ও শাগরিদে মাদানি মাওলানা নূর উদ্দীন গহরপুরী (রহ.) উপস্থিত ছিলেন। তাওবার রাজনীতি জনক মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর সঙ্গে ১৯৮২ সালে ইরান-ইরাক সফর করেন এবং ইমাম খোমেনি ও সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করেন। এই সফরে শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.), মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ (রহ.), মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.) প্রমুখ আলেম সফরসঙ্গী ছিলেন।
শাহতলীর পীর মাওলানা আবুল বাশার রহ. সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের প্রচার করতে আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগে শাহতলী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথমে ইসলাহি মাহফিলের সূচনা করেন। ২/৩ বছর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে মাহফিল হওয়ার পর থেকে বর্তমান স্থানে (হামানকর্দি) প্রতি বছর ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রæয়ারিতে ওই মাহফিল হয়ে আসছে। একাধারে নিয়ম করে কোনো মাহফিলের এমন ধারাবাহিকতা বেশ বিরল। ২০১৭ সালে ইন্তেকালের আগে বাংলাদেশ সফর করেন হজরত আব্দুল হাফিজ মক্কী (রহ.)। তখন হেলিকপ্টারযোগে তাকে শাহতলীর মাহফিলে নেওয়া হয়। এর আগে ঢাকায় ৭ দিনব্যাপী মাহফিল করতেন তিনি। তিনি বেশি কিছু দ্বীনি ও সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছেন। তন্মধ্যে নিবন্ধিত সংগঠন ইছলাহুল মুসলিমীন বাংলাদেশ অন্যতম। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন কওে গেছেন। ছোট বয়সে তিনি হযরত কারী ইরাহিম সাহেব কে সরাসরি দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
চাঁদপুর কচুয়া খানার সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া আহমদিয়া মাদ্রাসায় সর্বপ্রথম শিক্ষা সূচনা করেন। পরে একই থানায় মনপুরা আলিয়া মাদ্রাসায় প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষালাভকরেন।
তারপর শাহতলীর প্রাচীনতম কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এবং এখানেই দীর্ঘদিন শিক্ষা অর্জন করে ফাজিল শাহতলী আলিয়ার পরে চাঁদপুর চিশতিয়া কলেজে ১ বছর অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে ফিকাহ করে অর্থাৎ উচ্চতর শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় চলে আসেন। এবং বাড়ীতে থেকে কামিল পাশ করেন। বার্ষিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে মেধা তালিকায় এক নম্বর স্থান অর্জন করেন।
এছাড়া দেওবন্দী সিলসিলার প্রখ্যাত বুযুর্গ শায়খুল হাদীস মাওলানা আকারিয়া (রহ.) এব আজাল্লে খলিফা মাওলানা শায়খ আব্দুল হাফিজ মাক্কী (রহ) এর নিকট হতে ২০১২ সালে এয়ারপোর্ট বাবুস সালাম মাদ্রাসায় প্রায় দুই শত উলামায়ে কেরামের উপস্থিতিতে বিশেষ ভাবে খেলাফত প্রাপ্ত হন। শায়খ মক্কী ভরা মজলিসে তার মাথায় সাদা পাগড়ি বেঁধে দেন যেমনটা শায়খ জাকারিয়া তার সাথে করেছিলেন। অপরদিকে পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম মাওলানা শেখ ইদ্রিস জিলানী (রহ) থেকেও ইয়াযত তথা খেলাফত প্রাপ্ত হন। শায়খ মক্কী সাহেবের ইন্তেকালের পর দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন আমিরুল হিন্দ মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানী সাহেবের সাথেও ইসলাহী সম্পর্ক কায়েম করেন। বায়াতের পদ্ধতি। তিনি বায়াত করানোর সময় শায়খ সৈয়দ ইসহাক সাহেব ও শায়খ আব্দুল হাফিজ মক্কী (রহ.) এর পক্ষ থেকে সিলসিলার বায়াত করাতেন।
ইন্তেকাল
২৮/১১/২০২৩ থেকে শারিরীক অসুস্থতাবৃদ্ধি পেতে থাকে। স্ট্রোক করায় প্রথমে বারডেম হাসপাতালে পর পর কয়েকবার চিকিৎসা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১১/০২/২০২৫ ঈসায়ী বারডেম ভর্তির পর থেকেই ক্রমশ দূর্বলতা বৃদ্ধি পায়। অবশেষে গত বুধবার ১৮ রমজান (১৯ মার্চ ২০২৫) ইফতারের পূর্বমুহুর্তে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
কালেমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইহজগৎ ত্যাগ করেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন।
পরদিন বৃহস্পতিবার বাদ জোহর চাঁদপুর জেলার মৈশাদী ইউনিয়নের শাহতলীর হামানকর্দিস্থ নিজ বাড়ি সংলগ্ন মাঠে নামাজে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়।
মরহুমের ৫ম ছেলে মাওলানা জাফর আহমাদ শাহতলীকে তিনি জীবদ্দশায় খেলাফত প্রদান করেন। পীরসাহেবের জানাজার আগে খলিফাগণ ও পারিবারিক সদস্যদের এক যৌথ পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে মাওলানা জাফর আহমদ শাহতলী কে দরবার পরিচালনার জন্য মরহুম পীরসাহেবের স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে তিনিই মরহুম পিতার জানাজার ইমামতি করেন। আল্লাহপাক হযরতকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।
(লেখক : খলিফা, পীরছাহেব শাহতলী (র.) ও মজলিশে শূরার সদস্য, জামিয়া খানকায়ে বাশারিয়া রাজেন্দ্রপুর, গাজীপুর।)
---------------- 












