২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘৩৬ জুলাই’। কারফিউ ভেঙ্গে সকাল থেকেই খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে নগরীর কোর্ট পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। এদিনও ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালিয়েছে পুলিশ। বেলা ১২টার দিকে নগরীর বন্দরবাজার এলাকার মধুবন মার্কেটের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। দুপুরের দিকে খবর আসে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। এ খবর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর সিলেটের পাড়া মহল্লা থেকে মানুষের ঢল নামে রাজপথে। তারা ¯েøাগানে, মিছিলে বিজয় উল্লাস করতে থাকেন। মুহুর্তেই সিলেটের সব মিছিল মিলেছিলো নগরীর চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে।
এদিকে বিকেলের দিকে দক্ষিণ সুরমায় ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন দক্ষিণ সুরমার সিলাম পদ্মলোচন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইয়ান আহমেদ (১৬)। তিনি সিলাম ডালিফারা গ্রামের নানু মিয়ার ছেলে।
এদিকে হাসিনা পালানোর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর একদল লোক সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ছাড়াও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন দোকানপাট, ফার্মেসি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এ দিন বেলা তিনটার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনা ঘটেছে।
বিকাল সোয়া তিনটার দিকে সিলেটের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আগুন দেয় এক দল লোক। এরপর সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়, জেলা পরিষদ কার্যালয়, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরের বাসা, সোবহানীঘাট ও লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ি এবং দক্ষিণ সুরমা থানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও বাসায় অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর করা হয়।
এ দিন নগরীর অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে নগরের নয়াসড়কে ফ্যাশন হাউস ‘মাহা’র শোরুমে হামলা ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একই ভাবে নগরের চৌহাট্টায় ইউনিক ফার্মা ও মেসার্স শাহপরান ফার্মেসিতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
এদিকে বিকেলের দিকে মাইক হাতে পিকআপ ভ্যানে করে শহর ঘুরে বেড়ান সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার জন্য জনগণের প্রতি আহŸান জানান। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মাইকিং করে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ও লুটপাটকারীদের প্রতিহত করার আহŸান জানান এই বিএনপি নেতা। আগের দিন ৪ আগস্ট আন্দোলন শহর ছাপিয়ে পৌঁছে যায় গ্রামাঞ্চলে। দুপুর থেকে সিলেটের গোলাপগঞ্জে হামলা শুরু হয়। পাল্টা প্রতিরোধে যোগ দেন কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, আইনজীবী, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী সর্বস্তরের মানুষ। এমন সময় সরাসরি গুলি করে ছয় জনকে হত্যা করা হয়, যাদের বেশিরভাগই খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন আন্দোলন ও হতাহতের ঘটনা দেখেনি সিলেটবাসী। সকাল থেকে গোলাপগঞ্জ শহরে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছিলেন সাধারণ ছাত্রজনতা। একই সময়ে ঢাকাদক্ষিণ বাজারে বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ গেট থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করলে পুলিশ-বিজিবি ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা হামলা করে। সেখান থেকে শুরু হয় পাল্টা প্রতিরোধ। মৃত্যু বরণ করেন ৫ জন ছাত্র জনতা।
সিলেট জেলায় শহিদ হলেন যারা
জুলাই আন্দোলনে সিলেট জেলায় শহিদ হয়েছেন ১৩ জন। এর মধ্যে নগরীতে সাংবাদিক তুরাবসহ চারজন, জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ছয়জন, বিয়ানীবাজারে তিনজন। শহীদরা হলেন-সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব, তারেক আহমদ, মো. নাজমুল ইসলাম, মো. তাজ উদ্দিন, সানি আহমেদ, গৌস উদ্দিন, মিনহাজ আহমদ, মো. পাবেল আহমদ কামরুল, জয় আহমেদ, সোহেল আহমদ, মো. মোস্তাক হোসেন ও ওয়াসিম ও ময়নুল ইসলাম।
সিলেটে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে জুলাই আন্দোলন: ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে সিলেটে কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র গতি পায়। বিশেষ করে ১৪ জুলাই চীন থেকে ফিরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দেওয়ায় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ জুলাই দিবাগত রাত ১টার দিকে শাবিপ্রবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ করেন। রাত ১১টার দিকে হঠাৎ সৈয়দ মুজতবা আলী হল থেকে শুরু হয় ‘তুমিকে, আমি কে রাজাকার, রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে ষৈ¦রাচার স্বৈরাচার’ ¯েøাগান। মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থীর শুরু করা প্রতিবাদ মিছিল ছড়িয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধু হল, শাহপরাণ হলসহ অন্যান্য আবাসিক হলে।
সে সময় আন্দোলনকারী শাবির লোক প্রশাসনের শিক্ষার্থী আলতাফুর রহমান তাসনিম জানান, মুজতবা আলী হল থেকে ছাত্রদের মিছিল বের হলে শাহপরাণ হলে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তা প্রতিরোধে নামে। এই সময় ¯েøাগান দেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর চড়াও হয় তারা। খবর পেয়ে ঘটনার ১৫ মিনিট পর প্রধান ফটক থেকে আন্দোলনকারী অন্য শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। তারা ছাত্রীদের হলের সামনে গিয়ে শ্লোগান দিলে শতাধিক ছাত্রী মধ্যরাতে হল থেকে বের হয়ে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলে নারী শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মনোবল আরও দৃঢ় করে তোলে। একপর্যায়ে ক্যাম্পাসে প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও মিছিলকারীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে গিয়ে সমবেত হয়। এই সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ফের মিছিলে হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে আন্দোলনকারী বেশ কয়েক জন আহত হন।
পরদিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। ১৪ জুলাই শাবি ক্যাম্পাস ছাড়াও সিলেট শহরে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির বরাবর স্মারকলিপি দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপিতে সরকারি চাকরিতে ৯৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত এবং সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ অনগ্রসর ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়।
সন্ধ্যার পর সিলেট নগরের চৌহাট্টার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল বের করা হয়। যার ফলে ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক আন্দোলন সারা শহরে ছড়িয়ে যায়। আজ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের এইদিনে ছাত্র-জনতার তীব্র গণ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। পদত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী ভারতে পালিয়ে যান। সেদিন দুপুরে সেনাবাহীনির একটি বিশেষ বিমানে দেশ ছাড়েন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর তিনদিন পর নোবেলজয়ী ড. অধ্যপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালিন সরকার।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








