সিলেট সীমান্তে এক ইঞ্চি ভূমিও পায়নি বাংলাদেশ
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০১:৫৬ PM

ছিটমহল বিনিময়ে ছিল নতজানু পররাষ্ট্রনীতি

সিলেট সীমান্তে এক ইঞ্চি ভূমিও পায়নি বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২/০১/২০২৬ ১২:২৪:৩২ PM

সিলেট সীমান্তে এক ইঞ্চি ভূমিও পায়নি বাংলাদেশ


তামাবিল শুল্ক বন্দর সংলগ্ন এলাকায় ১৫/২০ গজ দূরে ভারত। সঙ্কুচিত হয়েছে নোম্যান্স ল্যান্ড। পাশেই একটি টিলা। সেই টিলা এখন ভারতের দখলে। আন্তর্জাতিক সীমানারেখা অনুযায়ী উভয় দেশের দেড়শ গজ নোম্যান্স ল্যান্ড থাকার কথা থাকলেও সিলেটের গোয়াইনঘাটের তামাবিলে সেটা নেই।  

এভাবে সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর এলাকার বিভিন্ন সীমান্তে ভূমি দখল নিয়ে জিরো লাইন সঙ্কুচিত করেছে ভারত। সীমান্তের সাব পিলার সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এভাবে অন্তত ২০০ একর বাংলাদেশি ভূখণ্ড ভারত তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয় ২০০৯ সালে এবং তৎপরবর্তী ২০১৫ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আওতায়। আর এটা সম্ভব হয়েছিল নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে। এরপরও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং সে দেশের খাসিয়াদের সীমান্তে ভূমি জবরদখলের চেষ্টা থেমে নেই।

প্রায় দুই যুগ আগে থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের দখলে থাকা ভাইরাল মাঠ খ্যাত নলজুড়ি বিলে খেলার মাঠের ৬-৭ একর ভূমি বারবারই দখল করতে উদ্যত হয়েছিল বিএসএফ। বিজিবির সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রতিবাদ করলে তারা পিছু হটে।

স্থানীয়রা জানান, ভারত বলতে চায়, মাঠটি তারা শেখ হাসিনার সময়ে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আওতায় পেয়েছে। কিন্তু সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকরা সেটা মানতে নারাজ। তাদের মতে, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন, চুক্তিও শেষ। যে কারণে সম্প্রতি এই জায়গাটি বিএসএফ দখল নিতে চাইলে স্থানীয়রা তাদের তাড়িয়ে দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাদুয়া ক্যাম্প দখলের জেরে ২০০১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। সিলেটের পাদুয়ার পর কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ির বিডিআর ক্যাম্প (বর্তমান বিজিবি) দখলের চেষ্টা করে ভারত। সে সময় বিডিআর সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সশস্ত্র সংঘাতে ভারতীয় ১৬ বিএসএফ ও বিজিবির ২ জনসহ ২১ জন নিহত হন।

স্থানীয়রা আরও জানান, ১২৭৮-১২৭৯ পিলারের মধ্যে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলার মাঠে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আলোকে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ করে পিলার বসানো হয়েছিল। ওই পিলারে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পড়ে খেলার মাঠসহ আরও কিছু কৃষি জমি। এরপর থেকে বাংলাদেশ অংশের লোকজন এই ভূমি দখলে রেখে ব্যবহার করে আসছিলেন। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির অধীনে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে সিলেট সীমান্ত এলাকার কিছু ছিটমহল ভারতের অংশে গেছে। কিন্তু নামে ছিটমহল বিনিময়, সে সময় সিলেট সীমান্তে বাংলাদেশ এক ইঞ্চি ভূমিও পায়নি। যদিও কিছু বিরোধপূর্ণ স্থান (যেমন খেলার মাঠ) নিয়ে এখনো স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা হতে দেখা যায়। চুক্তি অনুযায়ী এগুলো হস্তান্তরিত হলেও কেবল জরিপে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে জায়গা ছাড়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, সিলেটের গোয়াইনঘাটে খাসিয়া হাওর তামাবিল স্থলবন্দর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। এরপর পাদুয়া, প্রতাপপুর, আমস্বপ্ন, কাঁঠালবাড়ি, কেন্দ্রি বিল, ইয়ামবিল এলাকা নিয়ে ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সংঘাত ছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১৭ জুন গোয়াইনঘাট নলজুড়ি, তামাবিল, আমস্বপ্ন, সংগ্রাম, লামাপুঞ্জি, প্রতাপপুরের পাদুয়া, সোনার হাট, বিছানাকান্দির লক্ষণছড়া, কুলুমছড়া ও জৈন্তাপুরের নলজুড়ি ও আগুছড়া এলাকার ২০০ একর ভূমি জোরপূর্বক দখলে নেয় বিএসএফ। এর মধ্যে পাদুয়া-প্রতাপপুরে ৭০ একর, ডিবির হাওরে ৮০ একর, খাসিয়া হাওর-নলজুড়িতে ৩০ একর এবং কুলুমছড়া ও অন্যান্য এলাকায় ২০ একর।

স্থানীয় দিলোয়ার হোসেন জানান, পাদুয়া সীমান্তে ৫৭ বা ৫৮ মেইন পিলারের দৈর্ঘ্য লামাপুঞ্জি থেকে সোনার হাট পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার। যেখানে বাংলাদেশের কৃষকরা কৃষি ক্ষেত করতো। ওই জায়গা নিয়ে ২০০৯ সালে ডিবির হাওর শাপলা বিলের গোলাগুলি হয়। স্থানীদের অনেকে আহত হন। কিন্তু ওপরের নির্দেশে বিজিবিকে পিছু হটতে হয়েছিল। সে সময় বিজিবি ৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহুরুল ও টুআইসি ছিলেন মেজর মামুন। নির্দেশিত হয়ে তারা কেঁদে কেঁদে সরে আসতে বাধ্য হন। পরে ব্যাটিলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরকে ওএসডি এবং মেজর মামুনকে সিলেট থেকে সদর দপ্তরে বদলি করা হয়।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, সে সময় এ দুই কর্মকর্তাসহ বিজিবির পুরো ব্যাটালিয়ন এমনকি সুইপার পর্যন্ত অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন দেশের এক ইঞ্চি মাটি ছাড়বেন না বলে। কিন্তু বাংলাদেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিজিবি।

স্থানীয় বাসিন্দা মনজুর আহমদ বলেন, ২০১০-১১ সালে কেবল বাংলাদেশের অংশে জরিপ হয়। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই জরিপ কাজ চলে। ওই বছর রোড মার্চ হয় জরিপ কাজের নামে বাংলাদেশের জায়গা দখল হয়। মেইন পিলার থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ভেতরে পরিমাপ করা হয়েছিল। 

তিনি বলেন, জৈন্তাপুর নলজুড়ি থেকে বালুছড়া ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২০০ থেকে ৫০০ গজ প্রস্থ। গোয়াইনঘাট-নলজুড়ি, আমস্বপ্ন, তামাবিল, ডিবির হাওরে সংগ্রাম, লামাপুঞ্জি, প্রতাপপুর, পাদুয়া, সোনারহাট, লক্ষণ ছড়া, কুলুমছড়া, বিছানাকান্দি এলাকায় সে সময় মোট ২০০ একর ভূমি বিনাশর্তে ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয়। এসব ভূমি হাওর, চারণভূমি, ধানক্ষেত, সবজি ক্ষেতের জায়গা ছিল। এছাড়া তামাবিল শুল্ক স্টেশন থেকে নোম্যান্স ল্যান্ড আগেই দখলে চলে গেছে। বাংলাদেশের শুল্ক বন্দর থেকে ভারতের দূরত্ব মাত্র ১৫/২০ গজ। এই প্লটের পূর্বে আমস্বপ্নও দখলে গেছে। এখন শাপলা বিল পর্যন্ত বাংলাদেশিদের যেতে দেওয়া হয় না, ওপার থেকে বাধা দেওয়া হয়।

তামাবিল এলাকার কয়লা পাথর আমদানিকারক ইলিয়াস উদ্দিন লিপু বলেন, পাদুয়া এলাকার দখলকৃত ভূমি চার দলীয় জোট সরকারের সময় আনলেও পরে আওয়ামী লীগ তা ভারতকে দিয়ে দেয়। এখনো নলজুড়ি ভাইরাল খেলার মাঠ ভারতের দখলে। সেখানে বাংলাদেশিদের যেতে দেওয়া হয় না। অনেক কৃষি জমিতে ক্ষেত করতে দেওয়া হয় না।

জৈন্তাপুরের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, পাদুয়া বিল নিয়ে ২০০৯-২০১১ সাল পর্যন্ত বিএসএফ-বিজিবি যুদ্ধ হয়। সে সময় দেশের এক ইঞ্চি জমি দেবোনা বলে বিজিবির সঙ্গে নিজেও এগিয়ে গেছি। বলতে পারেন, সম্মুখ সমরের যোদ্ধা। কিন্তু এখন পাদুয়া মূল বিলের ৫০০ বিঘার ওপরে ভারতের দখলে। জৈন্তাপুরের শ্রীপুর করমপুর ৬০ বিঘা এবং তামাবিল সংলগ্ন ১০০ বিঘার টিলাটিও বেদখল হয়ে গেছে। সিটমহল চুক্তির সময় অনেক জায়গা অন্তর্ভূক্ত করে নিয়েছে ভারত। আমরা এক ইঞ্চিও পাইনি। 

স্থানীয়রা জানান, কুলুমছড়ায় ৬৩/৬৪ পিলার সংলগ্ন এলাকা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের জায়গা ভারতের দখলে গেছে। এখানে দেখানো হয়েছিল, ছিটমহল বিনিময় চুক্তির অধীনে এবং সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সীমান্ত পিলার স্থাপন ও চিহ্নিত করা হচ্ছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৮১ কিলোমিটার সীমানা বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ এর অধীনে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, সীমান্ত এলাকার ভূমির বিষয়টি কূটনৈতিক বিষয়। সবগুলো বিজিবির পর্যবেক্ষণে আছে। সীমান্ত শাখায় সব তথ্যে আছে। আমরাও সব বিষয়ে জ্ঞাত, কিন্তু এসব বিষয় খুবই সেনসেটিভ। বর্তমান অবস্থায় এগুলো নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভোর রাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বহু সদস্য ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। শুরু হয় বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীদের সাথে 'যুদ্ধ'। বিডিআর ও শত শত গ্রামবাসী মিলে ফাঁড়িতে হামলা প্রতিহত করে। ওই সময় বিএসএফের নির্মাণ করা অবৈধ চৌকিতে ৭০ জন বিএসএফ সদস্য আটকা পড়েছিল। পরে তারা সবাই আত্মসমর্পণ করে ফিরে যায়।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর