আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ডামাঢোল বাজছে। চারদিকে একই শুর ভোটের আলাপ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে এক আস্তা বিশ্বাসহীন ভোট মানসিকতা। এবারকার ভোট সেই ধারনাকে করেছে ইউটার্ন। প্রার্থীরা পুরোদমে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৫ দিন। তার মধ্যে ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার শেষদিন। শেষ দিন পর্যন্ত প্রার্থীরা লড়াই করে যাচ্ছেন। সিলেটের ছয়টি আসনে বিভিন্ন ধরণের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা।
সিলেটে ৬টি আসনে চারটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা অনেকটা নির্ভার। এই চার প্রার্থী হলেন সিলেট-১ আসনের খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, সিলেট-২ আসনের তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৩ আসনের এমএ মালিক ও সিলেট-৪ আসনের আরিফুল হক চৌধুরী। তবে সিলেট-৫ ও সিলেট-৬ আসনেও বিজয় পেতে পারে ধানের শীষ তথা বিএনপির শরীক। দরকার কেবল বঞ্চিতদের সহযোগিতা। তবে লড়াই করবে জামায়াতও। সেই লড়াইয়ে বিজয়ে মিশনে কোমর বেধে মাঠে আছে বিএনপি। সিলেট-১ : সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ নির্বাচনী এলাকা। ওই আসনে মোট ভোটার ছয় লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার তিন লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন ও নারী ভোটার তিন লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন।
সিলেট ১ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আট প্রার্থী। বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা হাবিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক), বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল (মই), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শামীম মিয়া (আপেল) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে সঞ্চয় কান্ত দাস (কাঁচি)।
এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দিতায় বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। তাদের দুই প্রার্থীর মধ্যে মূল ভোট যোদ্বা চলছে। মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এ দুই প্রার্থীই সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনের অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন ইতিপূর্বে। এর মধ্যে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০১৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সিলেট ১ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অপরদিকে মাওলানা হাবিবুরর রহমান সিলেট ১ আসনে নুতন প্রার্থী হলেও ২০০৮ সালে সিলেট ৬ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন।
সিলেট ১ আসন দেশের মর্যাদাপূর্ণ আসন। বলা হয়, ‘সিলেট-১ আসন যার-সরকার তার’। যে দল বিজয়ী হয় সেই দলই সরকার গঠন করে আসছে। হযরত শাহজালাল (রহ:) ও হযরত শাহপরাণ (রহ:) সহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমির এই আসনটি সব দলেরই কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত এটা মাথায় রেখে মাজার জিয়ারত এবং জনসভার মধ্যে দিয়ে সিলেট থেকেই শুরু হয় সব দলের নির্বাচনী প্রচারণা।
সূত্র জানায়, ১৯৭৩ সাল থেকে মিথ প্রচলিত হলে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার সূত্রপাত হয় আশির দশকে জাতীয় নির্বাচন থেকে। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে সিলেট অঞ্চলের ১৯টি আসনের মধ্যে শুধু সিলেট-১ আসন থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মালিক। বিএনপিই সরকার গঠন করে। এরপর স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান, দুই মেয়াদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নির্বাচন করে বিজয়ী হন। সরকার গঠন করে যথাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ২০১৮ সালে এ আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হন মুহিতের ছোট ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেন। আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করলে মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সিলেট-১ আসনে একতরফা নির্বাচনে এ কে আব্দুল মোমেন জয়ী হন। তখনো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।
সিলেট-২ : প্রবাসী অধ্যূষিত বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসন। এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৬৮ হাজার ৯৩২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৭৯ জন ও নারী ভোটার এক লাখ ৮০ হাজার ২৫৩ জন।
সিলেট ২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপি নেতা নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। অপরদিকে জামায়াত প্রার্থীকে সরিয়ে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এখন খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী। এছাড়া আসনটির অপর তিন প্রার্থী হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আমির উদ্দিন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী (লাঙ্গল) ও গণফোরামের মো. মুজিবুল হক (উদীয়মান সূর্য)। তাদের মধ্যে শক্ত দুই প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা ও মুহাম্মদ মুনতাছির আলী এ আসনে তুমুল লড়াই। একে অপরের প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিনই। ভোটারদের মাঝে এক উৎসব আমেজ দেখা দিয়েছে। ধানের শীষের পালে হাওয়ার অন্যতম শক্তি নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর। মানুষের মধ্যে ইলিয়াস আলী এক আবেগ ভালোবাসা। এই আবেগ নিয়ে ধানের শীষের জোয়ার বিজয় নিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগরবাসী।
সিলেট-৩ : বিভিন্ন কারনে সিলেট ৩ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিএনপির কাছে এই আসনটির অত্যন্ত মর্যাদার। কারন এই আসনেই রয়েছে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুরালয়। এক সময় এই আসটিতে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন শফি আহমদ চৌধুরী। কিন্তু ২০২১ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কারনে দল থেকে বহিষ্কার হন তিনি। সিলেটের প্রবেশদ্বার খ্যাত দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসন। এ আসনে চার লাখ ১৬ হাজার ভোটার। এর মধ্যে এ আসনে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ১১ হাজার ৭০৯ জন ও নারী ভোটার দুই লাখ চার হাজার ২৮৯ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার দুই জন।
সিলেট-৩ এ নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দিতায় রয়েছেন ছয় প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালিক, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু (রিকশা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী (হাতপাখা)। এছাড়া দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (ফুটবল) ও মইনুল বকর (কম্পিউটার)।
এ আসনে সাধারন ভোটার মনে করছেন জামায়াতের প্রার্থী দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ থাকলে বিএনপির প্রার্থী মালিকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জিং হয়ে যেত। এমন অবস্থায় প্রার্থী বদলে এই তিনটি উপজেলার সাধারণ মানুষ ভেঙ্গে পড়েছেন।
তবে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে তত এগিয়ে যাচ্ছেন জামায়াত সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দীন রাজু। আল্লামা গহরপুরী (র.) এর সন্তান হিসাবে তার একটা ভোট ব্যাংক আছে, সেটা সবাই স্বীকার করছেন। এম এ মালিকের জন্য চ্যালেঞ্জ পর্যায়ে নেই।
সিলেট-৪ : প্রাকৃতিক সম্পদের রাজ্য গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জ-জৈন্তাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসন।এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা পাঁচ জন। এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ১২ হাজার ৯৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৬৭ হাজার ১৩০ জন ও নারী ভোটার দুই লাখ ৪৫ হাজার ৮০২ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোট রয়েছে একটি।
এ আসনে বিএনপি আরিফুল হক চৌধুরী, জামায়াত ইসলামীর জয়নাল আবেদীন। তাদের মধ্যে দুজনই হেভিওয়েট প্রার্থী। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা জাহিদ আহমেদ (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম (ট্রাক) ও জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (লাঙ্গল)।
ধানের শীষ নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী শক্ত লড়াইয়ে আছেন। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন শুরু থেকে সিলেট ৪ আসনের জণগনের পাশে থেকে লড়াই করে আসছেন। বিএনপির প্রার্থী আরিফের সাথে বড় চ্যালেঞ্জিং জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। ভোটের উৎসবে মেতে উঠেছে সিলেট ৪ আসন। ভোটারদের বড় উৎসব হচ্ছে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লা।
সিলেট-৫ : দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসন। এবারের নির্বাচনে এ আসন থেকে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ২৮ হাজার ৭৪৮টি। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২১ হাজার ৩৫৭ জন ও নারী ভোটার দুই লাখ সাত হাজার ৩৯১ জন। এ আসনে কোন তৃতীয় লিঙ্গের ভোট নেই।
বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুর গাছ) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে লড়ছেন। অন্যদিকে জামায়াতের ১১ দলিয় সমর্থিত প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা মুফতি মাওলানা আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে আছেন বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত মামুনুর রশিদ ওরফে চাকসু মামুন (ফুটবল প্রতীকে)। এছাড়া নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন মুসলিম লীগের মাওলানা বিলাল উদ্দিন (হারিকেন প্রতীকে)।
সিলেট-৬ : প্রবাসী অধ্যুষিত গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৬ আসন। এ আসনে ভোটযুদ্ধে মাঠে রয়েছেন পাঁচ জন প্রার্থী। এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ নয় হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫৬ হাজার ৯৩৮ জন ও নারী ভোটার দুই লাখ ৫২ হাজার ১৫৫জন।
এ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে লড়াই করে দুই প্রার্থী। ৫ আগস্টের পর পর থেকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় এলাকায় গুড়ে গুড়ে গরিব দুঃখি মানুষের সমস্যা শুনে আসছেন। মাঠে হাঠে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার জণগনের ধারে ধারে গিয়ে ভোট চেয়ে আসন। বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে মাঠে থাকা হেভিওয়েট এই দুই প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী বাংলাদেশ সমর্থিত প্রার্থী হাফিজ মাওলানা ফখরুল ইসলামও। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের জহিদুর রহমান (ট্রাক) ও জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর (লাঙ্গল)।
তবে এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াত এখানে বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ। বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, জামায়াতে প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের মধ্যে হবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
আজকের সিলেট/এপি
আহমেদ পাবেল 








