যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন হরমুজ প্রণালীতে পাল্টাপাল্টি অবরোধ জোরদার করছে, সেই পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুনরায় চালু করা ‘অসম্ভব’ বলে জানিয়েছে ইরান।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে চলমান অচলাবস্থা শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বুধবার রাতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘প্রকাশ্য’ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খোলা সম্ভব নয়।
এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, ‘বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করা’ এবং ‘জায়নবাদী আগ্রাসন’।
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, আর দমন-পীড়নের মাধ্যমেও পারবে না।’
এর আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, তাদের নৌবাহিনী প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি জাহাজ থামিয়ে উপকূলে নিয়ে গেছে।
দেশটির তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানায়, পানামার পতাকাবাহী এমএসসি ফ্রানচেসকা এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এপামিনন্দাসকে গোপনে প্রণালী ছাড়ার চেষ্টা করার অভিযোগে আটক করা হয়। এপামিনন্দাস জাহাজটি গ্রিক মালিকানাধীন বলে গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।
একই দিনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা হরমুজ এলাকায় একাধিক হামলার খবর দেয়। এর মধ্যে একটি ঘটনায় একটি জাহাজের কাছে ইরানি গানবোট গিয়ে গুলি চালায়, এতে জাহাজটির ব্রিজে গুরুতর ক্ষতি হয়।
যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবার ইরান সরাসরি জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নিল। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি কার্গো জাহাজে গুলি চালায়, একটি তেলবাহী জাহাজে ওঠে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার প্রথমে হামলার হুমকি দিলেও পরে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেন।
সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বোমা হামলাই ভালো পন্থা… আমরা প্রস্তুত। সামরিক বাহিনী প্রস্তুত।’ পরে অবশ্য তিনি জানান, হামলা না করে অবরোধ চালিয়ে যাওয়া হবে।
এই যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি ট্রাম্প। ইরানের সরকার পতন বা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতেও এই সংঘাত সফল হয়নি।
বরং এর ফলে তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে বাধ্য হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।
প্রণালী পুনরায় চালুর জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও ট্রাম্পের চাপ ব্যর্থ হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অবরোধ আরোপ করে, ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জ্বালানি, সারসহ নানা কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুরক্ষিত হলেও পুরোপুরি নয়।
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অর্ধেকে নামিয়ে ০.৫ শতাংশ করেছে। গ্রিস সরকারও অতিরিক্ত ৫০০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা ঘোষণা করেছে।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস বলেন, ‘অর্থনীতি টিকে আছে, প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করছে। তবে নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানির খরচ, শিশু ও বয়স্কদের ব্যয়—সব মিলিয়ে চাপ রয়ে গেছে।’
জাতিসংঘের সামুদ্রিক সংস্থার প্রধান হরমুজ বন্ধ থাকায় উপসাগরে আটকে পড়া হাজারো নাবিককে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও ২ হাজার জাহাজ আটকে আছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন প্রস্তাব দিলেও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে, কিন্তু ইসলামাবাদের একটি বিলাসবহুল হোটেল, যেখানে আলোচনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, তা বুধবারও খালি ছিল। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি, আর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদলও ওয়াশিংটন ছাড়েনি।
এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘সব প্রস্তুতি নেওয়া ছিল। মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এটা অপ্রত্যাশিত একটি ধাক্কা, কারণ ইরান আসতে অস্বীকার করেনি, তারা এখনো আগ্রহী।’
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। ইসরায়েলের বিরোধিতার কারণে তিনি কূটনীতি থেকেও সরে আসেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার জন্য চাপ দিলেও, ওয়াশিংটনের আগের প্রশাসনগুলো তা এড়িয়ে গেছে। কারণ তারা এটিকে অকার্যকর ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী মনে করত।
এদিকে সংঘাত লেবাননেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইসরায়েল ও ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর মধ্যে দ্বিতীয় ফ্রন্টে লড়াই চলছে।
১০ দিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও বুধবার ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে চারজন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে সাংবাদিক আমাল খলিলও রয়েছেন।
দক্ষিণ লেবাননের আল-তাইরি এলাকায় পরিস্থিতি কাভার করার সময় খলিল ও আলোকচিত্রী জয়নাব ফারাজের সামনে একটি গাড়িতে হামলা হয়। তারা পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলে সেটিতেও হামলা চালানো হয়।
ফারাজকে উদ্ধার করা গেলেও খলিলকে পরে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা সাংবাদিকদের আহত হওয়ার খবর পেয়েছে, তবে উদ্ধারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হিজবুল্লাহ বলেছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে তারা উত্তর ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৪৫৪ জন নিহত হয়েছেন।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার প্রস্তুতি চলছে, যা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দুই দেশের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
দশকজুড়ে ইসরায়েল লেবাননে হামলা, আগ্রাসন ও দখল চালিয়েছে, আর লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে আসছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 








