হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন টোলনীতি কি বৈধ?
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯ PM

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন টোলনীতি কি বৈধ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮/০৪/২০২৬ ১০:২২:০০ AM

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন টোলনীতি কি বৈধ?


ইরান সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় শুরু করেছে। দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি জানিয়েছেন, এই টোলের প্রথম কিস্তির অর্থ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই টোল মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করছে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায়, আন্তর্জাতিক আইনে ইরানের কি এই টোল আদায়ের অধিকার আছে? উত্তরের জন্য ইতিহাসের ৫০০ বছর পিছিয়ে যেতে হবে।

ইতিহাসের পাতা থেকে 
পঞ্চদশ শতাব্দীতে স্পেন ও পর্তুগাল ছিল প্রধান সামুদ্রিক শক্তি। তারা পোপ আলেকজান্ডার ষষ্ঠের ১৪৯৩ সালের আদেশ অনুযায়ী সমুদ্র নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। অন্যান্য রাষ্ট্র তখন স্পেন ও পর্তুগালের অনুমতি ছাড়া সমুদ্র ব্যবহার করতে পারত না। এই অবিচারের বিরুদ্ধেই জন্ম নেয় ‘সমুদ্রের স্বাধীনতার নীতি’।

ষোড়শ শতক থেকে স্পেন ও পর্তুগালের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনে ‘নির্দোষ যাতায়াত’ (ইনোসেন্ট প্যাসেজ) ও ‘ট্রানজিট যাতায়াত’ (ট্রানজিট প্যাসেজ) দুটি পৃথক শাসন তৈরি হয়। ইরান আজ যে আইনি ভূমিতে দাঁড়িয়ে, তার শেকড় সেই সংগ্রামে।

ভৌগোলিক ও আইনগত বাস্তবতা
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। বছরে প্রায় ২০ হাজার জাহাজ চলাচল করে এখানে। ইরান ও ওমানের মাঝখানের এই সংকীর্ণ জলপথটির সর্বনিম্ন প্রস্থ মাত্র ৩৩ থেকে ৩৯ কিলোমিটার (প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল)। উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকা সম্পূর্ণরূপে উপকূলীয় দেশের সার্বভৌমত্বের অধীন। যেহেতু পুরো প্রণালির প্রস্থ ২১ নটিক্যাল মাইলের কম, তাই এটি ইরান ও ওমানের টেরিটোরিয়াল সি’র মধ্যেই পড়েছে। এর কোনো অংশই খোলা আন্তর্জাতিক জল নয়। এই মৌলিক সত্যটি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, কিন্তু আলোচনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

১৯৫৮ সালের জেনেভা কনভেনশন : ইরানের ভিত্তি
অধিকাংশ বিশ্লেষক শুধু ১৯৮২ সালের ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি (ইউএনসিএলওএস) নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু ইরানের অবস্থান আরও শক্ত। দেশটি ১৯৫৮ সালের জেনেভা কনভেনশনের ‘নির্দোষ যাতায়াত’ নীতির অধীনে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আইন কমিশন সমুদ্র আইনের খসড়া প্রস্তুত করে, যা ১৯৫৮ সালের জেনেভা সম্মেলনের ভিত্তি হয়। সেই সম্মেলনের ‘নির্দোষ যাতায়াত’ নীতি ছিল নতুন এক ধারণা।

পাহলভি আমল হোক বা ইসলামী প্রজাতন্ত্র; ইরান সব সময় এই নীতি মেনে এসেছে। ১৯৫৮ সালের কনভেনশনের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ বলে: যাতায়াত তখনই ‘নির্দোষ’ হবে, যদি তা উপকূলীয় রাষ্ট্রের শান্তি, শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর না হয়। ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ আরও স্পষ্ট: নির্দোষ যাতায়াত তখনই অর্জিত হয়, যখন জাহাজগুলো কেবল আঞ্চলিক সমুদ্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে না থেকে চলাচল করে এবং সামরিক হুমকি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ইচ্ছাকৃত দূষণ বা মাছ ধরা জাতীয় কাজে লিপ্ত না হয়। ডুবোজাহাজগুলোকে পানির নিচে চলাচল করতে দেওয়া হয় না, সামরিক জাহাজের চলাচল নিষিদ্ধ।

ইরান এই সনদ স্বাক্ষর করলেও সংসদে সব বিধান অনুমোদন করেনি। তবু দেশটি তখন থেকেই ‘নির্দোষ যাতায়াত’ শাসন মেনে আসছে।

ইরান কেন ১৯৮২ সালের ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ মানে না
১৯৮২ সালে নতুন রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সমুদ্রতলের তেল সম্পদের গুরুত্ব বৃদ্ধি, এবং মহান শক্তিগুলোর অবাধ চলাচলের আকাঙ্ক্ষার কারণে ইউএনসিএলওএস গৃহীত হয়। এই সনদ ‘নির্দোষ যাতায়াত’ নিশ্চিত করলেও ৩৪-৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘ট্রানজিট যাতায়াত’ নামে নতুন এক শাসন আনে। এর উদ্দেশ্য ছিল উন্মুক্ত সমুদ্র বা একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের দুটি অংশকে সংযুক্তকারী প্রণালীতে সব জাহাজ ও বিমানের অবিরাম, দ্রুত ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা।

ইরান ১৯৮২ সালের ১০ ডিসেম্বর এই সনদ স্বাক্ষর করলেও একইসঙ্গে একটি ব্যাখ্যামূলক ঘোষণা ও আপত্তি জারি করে। সংসদে সনদটির বিধান অনুমোদিত হয়নি। ইরানের দেওয়ানি আইনের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্ট: কোনো আন্তর্জাতিক সনদ তখনই কার্যকর হয় যখন সংসদ তা অনুমোদন করে। সুতরাং, ইরান আইনত ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ মানতে বাধ্য নয়। উল্টো, ১৯৫৮ সালের পুরনো ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’-ই ইরানের জন্য বৈধ কাঠামো।

মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও ১৯৮২ সালের এই সনদ অনুমোদন করেনি। অথচ তারা আজ ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে সনদের নিয়ম মানতে, যা নিজেরা মেনে চলে না। যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু সনদের পক্ষ নয়, তাই তাদের জাহাজ ও বিমান ‘ট্রানজিট যাতায়াত’ অধিকারের আওতায় পড়ে না। ইরান আইনত মার্কিন জাহাজ চলাচলের বিরোধিতা করতে পারে।

‘টোল’ বনাম ‘সার্ভিস ফি’: গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য
একটি সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি বিষয় বুঝতে হবে। ইউএনসিএলওএসের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলে: আঞ্চলিক সমুদ্রের মধ্য দিয়ে যাতায়াতের একমাত্র উদ্দেশ্যে বিদেশি জাহাজগুলোর ওপর কোনো চার্জ আরোপ করা যাবে না, সেই জাহাজকে প্রদত্ত নির্দিষ্ট সেবা ছাড়া। অর্থাৎ শুধু যাতায়াতের জন্য ‘টোল’ নেওয়া যাবে না, কিন্তু ‘নির্দিষ্ট সেবা’র বিনিময়ে ‘সার্ভিস ফি’ নেওয়া যায়।

ইরান এই ফারাকটা ভালো করেই জানে। তাই তেহরান এটাকে ‘টোল’ না বলে ‘সার্ভিস ফি’ হিসাবে উপস্থাপন করছে। ইরান দাবি করছে, তারা নিজের খরচে এসব সেবার অবকাঠামো তৈরি করেছে এবং এখন যৌক্তিক হিসাব অনুযায়ী অন্যদের এই খরচে অংশীদার করতে চায়।

ইরান কী কী সেবার বিনিময়ে ফি নিতে পারে?
নিরাপত্তার খাতায় ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বহুবার নৌচলাচলের নিরাপত্তা ও জলদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। হাজার হাজার স্পিডবোট, আত্মঘাতী ড্রোন এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্ম ইরানের প্রতিরোধ কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।

পরিবেশগত যুক্তিটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পারস্য উপসাগরে তেল দূষণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে হরমুজ অঞ্চলেই। গভীরতা মাত্র ১০ থেকে ৯০ মিটার হওয়ায় দূষিত উপাদান সহজে মিশে যায় না। পানি পূর্ণ সঞ্চালন হতে ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগে। এই দূষণ মোকাবিলার খরচ কে বহন করবে? পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ মোকাবিলায় ইরানের খরচ আদায়ের যুক্তি আন্তর্জাতিক আইনেই স্বীকৃত।

কোন সেবার বিনিময়ে? নৌ-নির্দেশনা (পাইলটিং), ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এসকর্ট, জরুরি উদ্ধার, এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ। বসফরাস প্রণালীতে তুরস্ক ঠিক এভাবেই ফি আদায় করে (মন্ত্রেক্স কনভেনশন, ১৯৩৬)।  বিশ্বের অন্যান্য সংকীর্ণ জলপথেও এই নজির আছে। হরমুজেও একই নীতি প্রয়োগের চেষ্টা করছে ইরান।

শত্রু জাহাজের জন্য কড়া নিয়ম
পার্লামেন্টে পাস হতে যাওয়া আইন অনুযায়ী, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো জাহাজ, আমেরিকার সামরিক জাহাজ, ইরান কর্তৃক ঘোষিত শত্রু দেশের জাহাজ, ইরানের ওপর অবরোধকারী দেশের জাহাজ এবং ইরানের সম্পদ জব্দকারী দেশের জাহাজ; এরা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে না। টোল দিতে হবে ইরানি রিয়ালে বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। আর সব চুক্তিতে ‘পারস্য উপসাগর’ নাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক।

ইরান সরকারের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
প্রথ
ম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফের বাণী স্পষ্ট: হরমুজ প্রণালিতে কখনোই বিনা মূল্যে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে না। কেউ ইরানের তেল রপ্তানিতে বাধা দেবে, আবার নিজেরা বিনা মূল্যে নিরাপত্তা চাইবে, এটা হতে পারে না। সামরিক বাহিনীর অবস্থান আরও কঠোর: হয় সব বন্দরের নিরাপত্তা থাকবে, নয়তো কারও জন্যই থাকবে না।

কাতার বলেছে, এই সংকটের আঞ্চলিক সমাধান দরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মজিদ আল-আনসারি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি সংকট অবশ্যই আঞ্চলিকভাবে এবং উপকূলীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণে সমাধান করতে হবে।

সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে যাতে প্রণালি অবরুদ্ধের মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চাপ দিচ্ছে’ যাতে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। সৌদিদের আশঙ্কা, এতে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়বে এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে।

একটি নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের অনেক দেশ ইরানের হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে। বিশেষ করে চোরাচালানি ও দস্যুবৃত্তি মোকাবিলায় ইরানের সফল অভিজ্ঞতা প্রশংসিত হয়েছে।

মার্কিন অর্থনীতিতে প্রভাব  
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ইরান টোল আদায় শুরু করায় পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে: ১. যেকোনো সংঘাতে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বে তেলের সরবরাহ কমে যাবে এবং জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হবে। ২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম এবং ইউরোপে গ্যাসের দাম ইতিমধ্যেই ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ৩. বিশেষ করে ‘ক্রিপ্টোকারেন্সিতে টোল আদায়’ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।

এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা
ন্তর্জাতিক আইনের জটিল এই জালে ইরান এককথায় ‘অবৈধ’ কিছু করছে না। ১৯৫৮ সালের জেনেভা কনভেনশন ইরানের পক্ষে আছে। ‘টোল’ হিসেবে নয়, ‘সার্ভিস ফি’র যুক্তি আইনসম্মত। বসফরাসের নজির ইরানের দাবিকে শক্তিশালী করে। আর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ১৯৮২ সালের সনদ অনুমোদন করেনি। তাই তাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার অধিকার ইরানকে আরও কঠোর হওয়ার সুযোগ দেয়।

ইরান চায় হরমুজের বুদ্ধিদীপ্ত, নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণ যেখানে শুল্ক আদায় হবে ডলারবহির্ভূত মুদ্রায়, যাতায়াত হবে বাছাই করা। পুরো পারস্য উপসাগরের ‘নিয়মের খেলা’ এখন লিখবে তেহরান। পৃথিবীর কোনো শক্তি সামরিক চাপে হোক বা কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় এই বাস্তবতা বদলাতে পারবে না।

হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ আজ কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের একাধিক স্তর বোঝার প্রশ্ন। আর সেই বোঝাপড়ায় ইরান এখন এগিয়ে।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর