সংস্কারেও সংকট কাটেনি পুঁজিবাজারে
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩১ AM

সংস্কারেও সংকট কাটেনি পুঁজিবাজারে

আজকের সিলেট ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯/০৪/২০২৬ ০৭:৫০:১৫ AM

সংস্কারেও সংকট কাটেনি পুঁজিবাজারে


জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সরকারের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি)। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন ওই বছরের ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর কারসাজি রোধে তৎপর হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হন।

নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজারে নানা অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ৫ কোটি টাকার মতো।
তবে বাজারে বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন।

পুঁজিবাজার মূলধন সংগ্রহের বাজার হলেও মাকসুদ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই বছরে বাজারে আসেনি একটিও আইপিও, যা বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টদের হতাশ করেছে।

একই সঙ্গে এই কমিশন দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সময়ে ডিএসইর সার্বিক সূচক কমেছে ৮ শতাংশ। এর জন্য অনেকটা সম্বনয়হীনতাকেই দ্বায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, মাকসুদ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৭৭৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। সর্বশেষ গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) লেনদেন শেষে এই সূচক দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩০০ পয়েন্টে। অর্থাৎ গত ২০ মাসে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ৪৭৮ পয়েন্ট বা ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট বাড়াচ্ছে।

এই সময়ের মধ্যে একটা ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বড় ধরণের সংস্কারের আশা করেছিলেন। কিন্তু সূচক ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে কমিশন নতুন বিধিমালা প্রণয়ন, সংস্কার টাস্কফোর্স ও তদন্ত কমিটি গঠনসহ পুঁজিবাজার সংস্কারে বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেও বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।

কমিশনের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মাকসুদ কমিশন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর এবং কার্যকরী করার জন্য বিএসইসির সকল কর্মীদের একত্রিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রায় সকল কর্মকর্তার উপর অবিশ্বাস করেছেন, যার ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বিএসইসির একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাশেদ মাকসুদ কমিশন জরিমানা আরোপ এবং  সংস্কারের উপর বেশি জোর দিয়েছিল, যদিও তার মেয়াদে বাজারে কোনো আইপিও অনুমোদন হয়নি। একজন নির্বাহী পরিচালককে বরখাস্ত করার পর বিএসইসির কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাকসুদ কমিশন।

অতীতের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কমিশন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ অনেকেরই অভিযোগ, কমিশনের সকল কর্মীকে এক ছাতার নিচে এনে বিএসইসিকে পুনর্গঠন করার মতো ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব রয়েছে। বিএসইসির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করেছে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার ফলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়। যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই অগোছালো থাকে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারানোর ভয়ে বাজার থেকে সরে দাঁড়ান বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু তাই নয়, ৫টি ব্যাংককে একীভূত করে এগুলোর মূলধন শূন্য ঘোষণা করা বর্তমান কমিশন সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এ সিদ্ধান্ত পথে বসিয়ে দেয় হাজার হাজার বিনিয়োগকারীদের। এঘটনায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে মাহ সিকিউরিটিজ হাউজের বিনিয়োগকারী মো. সাজিদ হোসেন বলেন, বর্তমান কমিশন দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে বিনিয়োগ নয় সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করেছে এতে করে অনেক বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। ৫টি ব্যাংক মার্জার হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক ক্ষতিরমুখে পড়েছেন। এক্ষেত্রে পুঁজির নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন।

গত ২০ মাসে বাজারে তারল্য না বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছে বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম। তিনি বলেন, প্রায় দুই বছরে একটা ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে না আসা বা আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়া হতাশাজনক। কারণ বিগত ১৫ বছরে দুয়েকটি ভালো স্টক ছাড়া সব দুর্বল কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনা হয়েছিল। তাই বর্তমান কমিশনের কাছে বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা ছিল তারা ভালো কোম্পানি বাজারে আনবে। তবে কমিশন নিজেই অভ্যান্তরীণ সমস্যায় জড়িয়ে পড়ায় বাজারে কাঙ্খিত ফলাফল আসেনি।

এদিকে বাজারকে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে বিএসইসিতে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে পুঁজিবাজারে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন।

তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের নেতৃত্বে বাজারে প্রত্যাাশিত স্থিতিশীলতা ও আস্থা তৈরি হয়নি। ২০২৪ সালের পর গঠিত কমিশনের কার্যক্রমে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি। পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে পুনর্গঠন প্রয়োজন। এতে স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব বাজার গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ক্যাপিটাল মার্কেটে দৈন্যদশা চলছে। ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী কমে ১২ লাখে নেমেছে। সক্রিয় বিও অ্যাকাউন্ট ৫ লাখও নেই। গত ১০ বছরে গ্রোথ কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসেনি। যে আইপিওগুলো এসেছে সবই দুর্বল কোম্পানির। বাজারে টার্নওভার নেই, ভলিউম নেই, সব জায়গায় সংস্কার দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, গণঅভ‍্যুত্থান পরবর্তী নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) জরিমানা করা ছাড়া আর কোনো উন্নতি দেখাতে পারেনি। বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। বড় পুঁজির বিনিয়োগ না হলে কখনই পুঁজিবাজার এগোবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহের উৎস। বিগত বছরের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি দ্রুত বিএসইসি পুনর্গঠন না করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং জাতীয় অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর