হাসপাতালে দুই ভাইবোন, অচেতন বাবা-মা শুধু নেই ছোট বোন জাইফা
শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০১:১২ PM

হাসপাতালে দুই ভাইবোন, অচেতন বাবা-মা শুধু নেই ছোট বোন জাইফা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৭/০৮/২০২৬ ০৬:৪৬:৫৭ PM

হাসপাতালে দুই ভাইবোন, অচেতন বাবা-মা শুধু নেই ছোট বোন জাইফা


সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে পাশাপাশি বসে আছে দুই ভাইবোন। ১৬ বছর বয়সী জান্নাতুল ও তার ছোট ভাই মোহাম্মদ। দুজনের চোখেমুখে বিস্ময়, আতঙ্ক আর শোকের ছাপ। যেন হঠাৎ করেই তাদের পরিচিত পৃথিবীটা বদলে গেছে। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে শুধু একরাশ প্রশ্ন।

শয্যায় অচেতন হয়ে পড়ে আছেন তাদের বাবা জাহাঙ্গীর আলম। পাশের বিছানায় আহত মা নুরুন নাহার। কিন্তু দুজনের চোখ বারবার খুঁজে ফিরছে যাকে, সেই ছোট বোন জাইফা আর নেই।

শুক্রবার সকালে ঢাকার বিক্রমপুরের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পুরো পরিবার নিয়ে ইউনিক পরিবহনের একটি বাসে উঠেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। দক্ষিণ সুরমার চণ্ডিপুল এলাকায় স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করতেন তিনি।

প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্যমতে, গাড়ির টায়ারের ব্যবসা করে সংসার চালাতেন জাহাঙ্গীর। সকালের সেই যাত্রা ছিল আর দশটা দিনের মতোই। ছিল বাড়ি ফেরার আনন্দ, প্রিয়জনদের সঙ্গে পথচলার স্বাভাবিক ব্যস্ততা। কিন্তু কেউ জানত না, এই যাত্রাই একটি পরিবারের জীবনে নামিয়ে আনবে ভয়াবহ অন্ধকার।

ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বিপরীতমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ইউনিক পরিবহনের বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় পরিবারের সব স্বপ্ন। প্রাণ হারায় পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য জাইফা। গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বাবা জাহাঙ্গীর আলম ও মা নুরুন নাহার।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনরা ঘিরে রেখেছেন অচেতন জাহাঙ্গীরকে। কথা বলার মতো অবস্থায় নেই তিনি। বাবার শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় দুর্ঘটনার কথা বলছিল জান্নাতুল।

জান্নাতুল জানায়, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সকালে আমরা সবাই ইউনিক বাসে উঠি। আমি আর আমার ভাই বাসের বাম পাশে বসেছিলাম। বাবা-মা ছোট বোন জাইফাকে নিয়ে ডান পাশে ছিলেন। হঠাৎ দেখি একটি মোটরসাইকেল বাসের সামনে এদিক-ওদিক চলাচল করছে। এরপর কী হয়েছে, ঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে, বিকট শব্দ হয়েছিল। তারপর আর কিছু বলতে পারি না।

তার সেই কথার মাঝেও যেন আটকে ছিল দুর্ঘটনার ভয়াবহ মুহূর্ত। একটি বিকট শব্দ, তারপর অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ওপারে হারিয়ে গেছে তাদের ছোট বোন জাইফা।

পরিবারটির প্রতিবেশী সামিয়া বেগমও বলেন, দীর্ঘদিনের টায়ার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথেই এই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন।

পুলিশ ও স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, শুক্রবার সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহন ও সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের বাস দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সাতজন। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় আরও দুজনের।

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর বলেন, ‘হাসপাতালে আহত অবস্থায় ১৬ জনকে আনা হয়। সেখানে আহত চার বছর বয়সী একটি শিশুকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত অবস্থায় (ব্রট ডেড) পাওয়া যায়, যার কারণ হিসেবে গুরুতর মাথার আঘাতকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। চিকিৎসাধীন ১৪ জনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

একটি পরিবার সকালে বের হয়েছিল গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে। হয়তো ছিল স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার আনন্দ, ছিল পথের গল্প, ছিল ঘরে ফেরার অপেক্ষা। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের এক সংঘর্ষে সেই পরিবারের একজন আর ফিরল না।

বাবা অচেতন, মা আহত। দুই ভাইবোন হাসপাতালের বিছানার পাশে বসে। আর তাদের ছোট বোন জাইফা যাকে তারা সবচেয়ে বেশি খুঁজছে সে এখন কেবল স্মৃতি।

কখনো কখনো একটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয় না; সঙ্গে কেড়ে নেয় একটি পরিবারের হাসি, স্বপ্ন আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তাও।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর