স্বাধীনতার পরও সেতুর অপেক্ষা, সুরমা পাড়ের মানুষের ভোগান্তি যেন শেষ হয় না
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৮ PM

স্বাধীনতার পরও সেতুর অপেক্ষা, সুরমা পাড়ের মানুষের ভোগান্তি যেন শেষ হয় না

জকিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০/০৯/২০২৬ ১০:৪১:১৬ AM

স্বাধীনতার পরও সেতুর অপেক্ষা, সুরমা পাড়ের মানুষের ভোগান্তি যেন শেষ হয় না


স্বাধীনতার পর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের জীবন, বেড়েছে যোগাযোগের প্রয়োজন। কিন্তু সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নের আটগ্রাম বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর ওপর একটি সেতুর দাবি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নদীর দুই পাড়ের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষের কাছে প্রতিদিনের পারাপার এখনো দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার নাম।

সুরমার ওই অংশে একটি সেতু না থাকায় জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন বিকল্প ব্যবস্থায় নদী পার হতে হয়। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কানাইঘাট উপজেলার কাড়াবাল্লা, বড়চাতল, কান্দি, দনা ও খাসিয়াপুঞ্জিসহ বেশ কয়েকটি এলাকার মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা ও নানা প্রয়োজনীয় কাজে জকিগঞ্জে আসেন। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে কানাইঘাটের সঙ্গে এসব এলাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগও গড়ে ওঠেনি। ফলে আটগ্রামের সুরমা নদীর এই অংশটি তাদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে জকিগঞ্জের চারিগ্রাম, মরিচা, জালালাবাদ, নালুহাটি ও রায়গ্রামসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের মানুষও এই পথ ব্যবহার করে কানাইঘাটের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন।

শুধু মানুষের চলাচল নয়, দুই উপজেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই পথ। কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত তাজা সবজি, ফল, পানসহ নানা পণ্য জকিগঞ্জের ব্যবসায়ীরা এই পথ দিয়ে সংগ্রহ করেন। কিন্তু সেতু না থাকায় এসব পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

শুষ্ক মৌসুমে নদী পারাপারের জন্য স্থানীয়রা বাঁশ ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেন। সেই সাঁকোই তখন হয়ে ওঠে দুই পাড়ের মানুষের ভরসা। কিন্তু বর্ষায় সুরমার পানি বাড়লে সেই পথও আর থাকে না। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে পারাপারের একমাত্র মাধ্যম। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

গত ২২ সেপ্টেম্বর আটগ্রামের সুরমা নদীর ওই স্থান পরিদর্শনকালে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশার চিত্রও দেখা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুর অভাবে শুধু যাতায়াতেই সমস্যা হচ্ছে না, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাদিকুর রহমান বলেন, এই স্থানে একটি সেতু না থাকায় পুলিশ ও প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ব্যাহত হয়। ফলে কানাইঘাট সীমান্তবর্তী দনা ও খাসিয়াপুঞ্জি এলাকা চোরাকারবারিদের জন্য নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই পথে চিনি, গরু ও মাদকদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে আনা-নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতে প্রবেশের সময় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের হাতে আটক হন।

দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে একটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুদ্দৌলাহ মান্না। খলাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও মরিচা গ্রামের বাসিন্দা তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থে এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন। ঠিক কী কারণে এটি হচ্ছে না, তা সুস্পষ্টভাবে বলতে পারছি না।

তবে সেতু নির্মাণের বিষয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম চলছে কি না, তা জানি না। এ বিষয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাও নেই।

ফলে স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসা একটি সেতুর দাবি এখনো আটকে আছে নদীর দুই পাড়ে। সুরমার ওপর স্থায়ী একটি সেতু কবে নির্মিত হবে, আর কবে শেষ হবে অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ উত্তর নেই সেই প্রশ্নের।

আজকের সিলেট/জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর