ইজারা নেই, সুনামগঞ্জের কয়েকটি বালুমহালে ফের অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ
বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ AM

ইজারা নেই, সুনামগঞ্জের কয়েকটি বালুমহালে ফের অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৬/১০/২০২৬ ০৩:৩৩:০৬ PM

ইজারা নেই, সুনামগঞ্জের কয়েকটি বালুমহালে ফের অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ


ইজারার আইনি জটিলতার মধ্যে সুনামগঞ্জের কয়েকটি বালুমহালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তাহিরপুরের যাদুকাটা ও দোয়ারাবাজারের মরাচেলা নদীতে দিন-রাত চলছে বালু তোলার কাজ। কোথাও কোথাও নদীর তীর কেটে বালু তোলার অভিযোগও রয়েছে।

শহরতলির ধোপাজান বালুমহালেও ইজারা ছাড়াই বিভিন্ন কৌশলে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন টাস্কফোর্সের অভিযান জোরদার করেছে। রোববার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান টানা এক সপ্তাহ চলবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনের ভাষ্য, ইজারাদার না থাকায় কিছু এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জের অন্যতম বড় বালুমহাল যাদুকাটা নদী। আগের ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ছয় মাসের জন্য নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিপরীতে খাস আদায়ের পরিকল্পনা করেছিল জেলা প্রশাসন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এরপর ২০ সেপ্টেম্বর যাদুকাটা-১ মহালের সাবেক ইজারাদার মাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছির উদ্দিন ১৯৫ দিনের জন্য ইজারা চেয়ে আবেদন করেন। একই দিন যাদুকাটা-২ মহালের সাবেক ইজারাদার জিনান এন্টারপ্রাইজের মালিক শাহ্ রুবেলও ইজারার আবেদন করেন।

পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব দেওয়ার শর্তে দুটি মহালই নাছির উদ্দিনকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে এই অনুমোদনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট করা হয়।

রিট পিটিশটির নম্বর ১৩৮৮০/২৬। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ সেপ্টেম্বর নাছির উদ্দিনকে দেওয়া অনুমোদনপত্র তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। ফলে বর্তমানে যাদুকাটার দুটি বালুমহালই ইজারাবিহীন রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারা কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। নদীর পাড় কেটে বালু তোলার ঘটনাও ঘটছে। এতে নদীভাঙনের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীতে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একটি চক্র শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে নদী ও নদীর তীর কেটে বালু তুলছে।

তাদের অভিযোগ, এভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন বেড়েছে। ঝুঁকিতে পড়েছে নদীর দুই পাড়ের বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি। এ নিয়ে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অবৈধ উত্তোলন বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছেন স্থানীয়রা। রোববার মরাচেলা নদীর কাজিরগাঁও এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা হয়।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত নৌকার শ্রমিকদের আটক করলেও মূল ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও নদীতে বালু তোলার কাজ শুরু হয়।

সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজান বালুমহালেও অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে প্রশাসন। পুলিশ সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মহালটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, কোনো বালু-পাথরমহালে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে এ ধরনের নজরদারি দেশে প্রথম।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইজারাবিহীন ধোপাজান বালুমহালে কয়েক দফায় ব্যাপক বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা এলাকায় ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা চলতি নদীর প্রবেশমুখে ধোপাজান বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ রক্ষায় ২০১৮ সালে আদালত কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেন।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেখানে আবার উত্তোলন শুরু হয়। পরে প্রশাসনের তৎপরতায় তা বন্ধ করা হয়। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাসে সরকারি সিদ্ধান্তে কিছুদিন নদীতে বালু উত্তোলন করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইজারাবিহীন মহালটিতে নানা কৌশলে বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে।

সুনামগঞ্জে সরকার অনুমোদিত বালুমহাল রয়েছে চারটি। এর মধ্যে খাসিয়ামারা বালুমহাল নিয়ে বড় কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। তবে চলতি (ধোপাজান), মরাচেলা ও যাদুকাটা বালুমহাল নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

সোমবার বালুমহালগুলোর পরিস্থিতি জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। ইজারা শুরুর আগের সময়ে খাস আদায়ের বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আদালতে রিট করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রিটের পরবর্তী করণীয় বিষয়ে জেলা প্রশাসন সরকারের কাছে নির্দেশনা চেয়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ইজারাদার না থাকার সুযোগে কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নেতৃত্বে অভিযান হয়েছে। মরাচেলা এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্যোগে আগামী এক সপ্তাহ টানা টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হবে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, প্রশাসনের কার্যক্রম পরিচালনার সময় তাঁরা দেখেছেন, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল একজন সজ্জন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তিনি স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। এ ধরনের মন্তব্যের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের নাম জড়ানোর কোনো অবকাশ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর