সিলেটের বিয়ানীবাজারে কুশিয়ারা নদী থেকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজন ও ইজারাদারপক্ষের মধ্যে বিরোধের জেরে উত্তেজনা, হামলা ও অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ড্রেজার, নৌকা ও চার শ্রমিক আটকে রাখার পাশাপাশি বিরোধ মীমাংসা করতে গিয়ে আরও দুই ব্যক্তিকে মারধর করে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে পুলিশের সহযোগিতায় চার শ্রমিক ও ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। একই ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চার সাংবাদিক বাধা ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ঘটনাটি ঘটেছে বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা ইউনিয়নের দীঘলবাক এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। অন্যদিকে, ইজারাদার জুবের আহমদের দাবি, এলাকার উন্নয়নের নামে চাঁদা না দেওয়ায় স্থানীয় একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে চাঁদা দাবি ও হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুশিয়ারা নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু সরানোর কাজ শুরু হয়। উত্তোলনের স্থান নিয়ে একপর্যায়ে স্থানীয়দের সঙ্গে ইজারাদারপক্ষের বিরোধ বাধে। এর জেরে ড্রেজার, নৌকা ও চার শ্রমিক আটকা পড়েন। অভিযোগ অনুযায়ী, সকাল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তাঁরা অবরুদ্ধ ছিলেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালু উত্তোলন করা হলে বসতবাড়ি ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। এ কারণে তাঁরা কাজ বন্ধের দাবি জানান। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যাননি বলে অভিযোগ তাঁদের।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদারের নির্দেশে মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে যান শেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুর উদ্দিন। তিনি দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা প্রথমে সমাধানে রাজি হলেও পরে ইজারাদারপক্ষের সব নৌকা কুশিয়ারা নদী থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। এতে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয় এবং সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
এরপর পার্শ্ববর্তী দুবাগ ইউনিয়নের গোয়ালপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ছেলে জাকির হোসেন বিরোধ মেটাতে ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের অভিযোগ, মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় কয়েকজন তাঁদের মারধর করে ফেলে দেন এবং পরে আটকে রাখেন।
খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ তাঁদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
নাজিম উদ্দিন ও জাকির হোসেনের দাবি, হামলাকারীরা তাঁদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ নিয়ে গেছে। এ ছাড়া তাঁদের একটি মূল্যবান চশমা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
ইজারাদার জুবের আহমদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় চুনু মিয়ার ইন্ধনে ফয়ছল আহমদ মিজু, নোমান আহমদ, এমরান আহমদ ও আশরাফসহ ১০ থেকে ১২ জন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাঁর দাবি, এলাকার উন্নয়নের নামে তাঁদের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। প্রথম দফায় অর্থ দেওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় দাবিকৃত টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় নদীভাঙনের বিষয়টি সামনে এনে বিরোধ সৃষ্টি করা হয়।
তবে জুবের আহমদ স্বীকার করেন, ড্রেজারটি ইজারার নির্ধারিত এলাকার বাইরে ছিল। তাঁর ভাষ্য, নদীর পানি কমে যাওয়ায় তাঁদের বালুবোঝাই স্টিমার তলদেশে আটকে যায়। পরে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আর্থিক বরাদ্দের বিনিময়ে নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে নদীর তলদেশ থেকে বালু সরানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়।
সেই অনুযায়ী মঙ্গলবার সকালে কাজ শুরু করা হলে স্থানীয় পক্ষগুলোর মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরেই ড্রেজার ও শ্রমিকদের আটকে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার একটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন জুবের আহমদ। ওই রেকর্ডে ফয়ছল আহমদ মিজু নামে এক যুবককে পরদিন সকাল থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার আশ্বাস দিতে শোনা যায়। তবে অডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নির্দেশে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে বলে জানান জুবের আহমদ।
অন্যদিকে, দীঘলবাক গ্রামের কয়েকজন যুবক ও মুরব্বির দাবি, ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এ কারণে তাঁরা ড্রেজার ও শ্রমিকদের আটকে রাখেন। তবে হামলা এবং কাউকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তাঁরা।
অভিযুক্ত চুনু মিয়া বলেন, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ড্রেজারের শ্রমিকদের ইজারাদারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ছেলে জাকির হোসেনকে নিরাপত্তার জন্য তাঁর বাড়িতে রাখা হয়েছিল। তাঁদের ওপর কোনো হামলা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চার সাংবাদিক বাধা ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন দৈনিক নয়াদিগন্ত ও জালালাবাদ পত্রিকার প্রতিনিধি তোফায়েল আহমেদ, দৈনিক কালবেলা ও সিলেটের ডাক-এর প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম সাজু, দৈনিক তৃতীয় মাত্রার প্রতিনিধি জয়নুল ইসলাম এবং দৈনিক সুরমা মেইল ও আজকের সিলেটের প্রতিনিধি মো. জয়নুল ইসলাম।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, অডিও রেকর্ডের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে সুমন আহমদ (পিতা: শামসুল মিয়া) ও আশরাফ আহমদ (পিতা: জলিল মিয়া) নামে দুই যুবক তাঁদের দিকে তেড়ে আসেন। এ সময় তাঁদের গালাগাল করার পাশাপাশি গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া ও ভয়ভীতি প্রদর্শন স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। তিনি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
শেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুর উদ্দিন বলেন, ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয়রা ড্রেজার ও শ্রমিকদের আটকে রেখেছেন এমন খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ইউএনওর নির্দেশে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেও সফল হননি। পরে রাতে পুলিশের সহযোগিতায় চার শ্রমিক ও দুই স্থানীয় ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়।
বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল করিম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করেছে। বর্তমানে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিয়ানীবাজারের ইউএনও উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়রা শ্রমিক ও কয়েকজন ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ পাঠিয়ে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউএনও আরও বলেন, দীর্ঘ সময় কাউকে অবরুদ্ধ করে রাখা উচিত হয়নি। সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা অনুচিত এবং তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
আজকের সিলেট/ জেকেএস









