নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলো আগে থেকেই হকারদের দখলে ছিল, এবার সেই দখলদারিত্ব ছড়িয়েছে ব্রিটিশ আমলের শতবর্ষী ক্বীনব্রিজ পর্যন্ত। লোহার তৈরি নগরীর প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কয়েক বছর আগে ব্রিজ দিয়ে সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর এই সুযোগে ব্রিজের দখল নিয়ে নেয় ভাসমান ব্যবসায়ীরা।
ব্রিজের দুইপাশ দখল করে সবজি, ফল, কাপড়সহ নানা ধরনের দোকানপাট বসানো হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ বেড়েছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে ব্রিজটির স্থায়িত্ব ও ঐতিহাসিক মূল্য। এ ছাড়া দখলের কারণে ব্রিজটি সংকুচিত হয়ে যান চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ সচেতনরা বলছেন, অতিরিক্ত ভরবহন ও কম্পন ব্রিজটির কাঠামোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি একটি লোহার তৈরি পুরনো ব্রিজ হওয়ায় তার রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষায় নিয়মিত নজরদারি জরুরি। নগরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত হকারদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে ক্বীন ব্রিজকে হকারমুক্ত করা হবে। একইসাথে ব্রিজটির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, হকারদের উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। তবু তাঁরা আবার দোকানপাট বসান।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন জানায়, সিলেট শহরকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত করেছে সুরমা নদী। দুই অংশকে জোড়া লাগাতে নদীর ওপর ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে লোহার একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। তবে যানবাহনের ভার বহন করে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কয়েক বছর আগে এখান দিয়ে সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন ব্রিজ দিয়ে ঠেলাগাড়ি, রিকশা, মোটরসাইকেলসহ হালকা যান চলাচল করে থাকে।
এ ছাড়াও ব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। অথচ বর্তমানে ব্রিজের উভয় পাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক হকারের অস্থায়ী দোকান, যা জনচলাচলে চরম বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্রিজের ওপর বসানো হয় বিভিন্ন পণ্যের দোকান। কাপড়, জুতা, ফলমূল, মোবাইল এক্সেসরিজ, খাবারসহ নানা রকমের পসরা নিয়ে বসে হকাররা। এর ফলে ব্রিজে চলাচলের জন্য নির্ধারিত পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। চলাচলকারী পথচারীদের মাঝেমধ্যে দোকানের পসরা ডিঙিয়ে চলতে হচ্ছে, আর যানবাহনের গতি হয়ে পড়েছে অত্যন্ত ধীর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রিজের দুই পাশ দখল করে অন্তত শতাধিক হকার সবজি, ফল, কাপড়, জুতা ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন। সেসব পণ্য দরদাম করে কিনছেন অসংখ্য ক্রেতা। ক্রেতা- বিক্রেতার ভিড়ে ব্রিজ দিয়ে হেঁটে চলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। যানবাহনের গতি কমে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।
ব্রিজপাড়ের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, আমার বাসা ঝালোপাড়ায়। বন্দরবাজার এলাকায় আমার দোকান রয়েছে। ব্রিজ দিয়ে হাঁটতেই কষ্ট হয়। মনে হয় যেন একটা হাঁটবাজার।
মোটরসাইকেল চালক আবিদুল ইসলাম বলেন, ব্রিজের ওপর দোকানপাট বসানোর কারণে জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। যে কারণে পথচারীরা সেতুর মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলাচল করছে। এ অবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্যে যানবাহন নিয়ে চলাচল করা যায় না। ব্রিজ বেদখল থাকায় আমাদের বেশি বিপাকে পড়তে হয়।
ব্রিজের আশপাশের এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, এখানে ভাসমান দোকানপাট থাকায় ময়লা-আবর্জনাও ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। এ ছাড়া ব্রিজের প্রকৃত সৌন্দর্যও আড়াল হয়ে যাচ্ছে। ব্রিজের দক্ষিণাংশে কদমতলী বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশন। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের এ ব্রিজ দিয়েই মূল শহরে ঢুকতে হয়। ব্রিজটি হকারদের দখলে থাকায় পর্যটকদের কাছেও এটি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে বলে মত তাদের।
আর হকাররা বলেন, আমরা কেউ শখ করে এখানে বসি না। পেটের দায়ে বসি। সরকার যদি একটা বিকল্প জায়গা করে দেয়, আমরা সেখানেই চলে যাব।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার বলেন, সেতু থেকে প্রায়ই হকারদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু সরিয়ে দেওয়ার পরও তারা আবার সেখানে দোকানপাট বসান।
তিনি বলেন সবাই মিলেই চেষ্টা করছি হকার নিয়ন্ত্রণ করার। এছাড়া অভিযান তো চলমান আছে।
আজকের সিলেট/ডি/এসটি
নিউজ ডেস্ক 








