আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা। আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন। তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন। আজ চিৎ-শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা। আজ মহালয়া, পিতৃপক্ষ শেষে দেবীপক্ষের সূচনা।
ভোরে মহালয়ার ঘট স্থাপন, বিশেষ পূজা আর মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে আবাহন জানানো হয়েছে। পিতৃপক্ষ শেষে সূচনা হলো দেবীপক্ষের। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গো পূজার ক্ষণ গণনা শুরু হলো আজ। এদিনই দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হয়। মূলত: মহালয়ার তিথির সময়কাল হলো অমাবস্যা। এই দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করার রীতি প্রচলিত আছে।
আসছে আগামী ২৮শে সেপ্টেম্বর মহাষষ্টীর মধ্যে দিয়ে পূজার সূচনা হবে। মা কৈলাশ ছেড়ে তাঁর সন্তানদের নিয়ে আসবেন পিতৃলোকে। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠায় মর্ত্যে আসবেন দেবী দুর্গা। ঢাক-ঢোল আর কাঁসার বাদ্যে দেবীর বোধন পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ২৯শে সেপ্টেম্বর মহাসপ্তমী তিথিতে দেবীর নবপত্রিকা স্থাপন সপ্তম্যাদি কল্পারম্ভের মধ্যদিয়ে হবে মহা সপ্তমী পূজা। এই নব পত্রিকাই ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। নবপত্রিকাকে সিদ্ধিদাতা গণেশের পাশে অধিষ্ঠিত করা হবে। এই দিনই দেবীর মৃণ্ময়িতে প্রাণ সঞ্চার করা হয়। পরদিন ৩০শে সেপ্টেম্বর মহাঅষ্টমী তিথিতে সনাতনী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সকলে মিলে দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি দেয়া হবে। এইদিনই হবে সন্ধীপূজা। মাতৃরূপে কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা কল্পনা করে জগজ্জননীর উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করে হবে ‘কুমারী পূজা’। শাস্ত্রমতে, এদিন পূজিত কুমারী কন্যার নামকরণ করা হয় ‘উমা’। ১ অক্টোবর নবমীতে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর মহা প্রসাদ বিতরণ করা হবে। সর্বশেষ ২ অক্টোবর দশমী তিথিতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হবে দেবী দুর্গাকে।
পুরাণ মতে, মহিষাসুর দেবতাদের সাথে লড়াই করার জন্য শক্তিশালী হতে চেয়েছিল এবং অমরত্ব লাভ করতে চেয়েছিল, কিন্তু ব্রহ্মা তাকে সরাসরি অমরত্ব দেননি। বরঞ্চ ব্রহ্মা মহিষাসুরকে এমন বর দেন যে তাকে কোনো দেব, দানব বা অসুর মারতে পারবে না। সঙ্গে একটি শর্তও ছিল – মহিষাসুরের নিধন হবে শুধুমাত্র কোনো নারীর হাতে। মহিষাসুর এই শর্তটিকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল এবং ভেবেছিল কোনো নারী তাকে পরাজিত করতে পারবে না। বর পেয়ে স্বর্গ দখল নেয় অসুর রাজা মহিষাসুর। অসুরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল। তখন দেবতারা একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করেন আদি শক্তি মহামায়া দেবী দূর্গাকে। দেবতাদের অস্ত্রে সজ্জিত করা হয় দেবীকে। বাহন সিংহে চেপে দেবী যান অসুর বধে। রম্ভাসুর, তারকাসুর একে একে বধ করেন সকলকে। মহিষাসুরকে বধের মধ্য দিয়ে ত্রীলোকের শান্তি ফিরিয়ে আনেন দেবী দুর্গা। দেবীর সেই মহিষাসুর বধের দৃশ্যই কল্পনা করে তখন থেকে মর্ত্য অর্থাৎ আমাদের মানবকূলে দেবী দুর্গার পূজা শুরু হয়।
সিলেট মহানগরীর গোপালটিলা সার্বিজনীন দূর্গা মন্দির পুরোহিত বলেন, এবার দেবীর গজে আগমন ও দোলায় গমন। মায়ের গজে আগমনের ফলশ্রুতি মায়ের গজে আগমনের ফলশ্রুতি হলো মর্ত্যলোকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখের আগমন, যেখানে শস্যশ্যামলা বসুন্ধরা এবং মানুষের জীবন সুখে-শান্তিতে ভরে ওঠে। আর মায়ের দোলায় গমন ফল শ্রুতি মর্ত্যলোকে মহামারী, ভূমিকম্প, খরা, যুদ্ধ এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটার আশঙ্কা থাকে, যা অত্যন্ত অশুভ একটি সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়।
শারদীয় দুর্গোৎসবের আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। আজ মহালয়ার প্রভাতেই চণ্ডীপাঠে ধ্বনিত হবে দেবী আবাহনের আহ্বান। আর সেই অপেক্ষাকে সামনে রেখে সিলেটের মণ্ডপগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পীরা। নগরীর বিভিন্ন কর্মশালায় প্রতিমা রূপায়ণে এখন দিন-রাত সমানতালে কাজ চলছে। কারও তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে দেবীর নয়ন, কারও হাতে অলংকৃত হচ্ছে শারদীয় রূপসজ্জা। শিল্পীদের ঘামে ভিজে উঠছে কর্মশালা, তবুও তাঁদের চোখেমুখে নেই ক্লান্তি—বরং ভক্তির দীপ্তি। এবার সিলেট জেলা ও মহানগরে ৬৬৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, পূজার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। মণ্ডপগুলোতে সজ্জার কাজও শুরু হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক, অ্যাডভোকেট রঞ্জন ঘোষ বলেন, আমরা প্রশাসনের সব পর্যায়ের সাথে কথা বলেছি। মহানগরে প্রতিটি প্রতিমা তৈরির জায়গায় ১৫ দিন আগে থেকেই প্রশাসন নিরাপত্তা জোরাল করেছেন। ভিবিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আমাদের কথা হয়েছে উনারা আমাদের সর্বচ্চ সহযোগিতা করছেন ও করবেন এ ছাড়া প্রতিটি পূজা মন্ডপে ভলেন্টিয়াররা রাখার কথা আমরা বলেছি। যেকোনো প্রয়োজনে প্রশাসনকে জানানোর কথাও আমরা বলেছি। আমাদের বাংলাদেশ পূজা উৎযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে সিলেট জেলা ও মহানগর মিলে দশ সদস্যের একটি মনিটরিং স্যাল তৈরি করেছি, আমরা সার্বক্ষণিক নজর রাখবো। প্রয়োজনে আমাদেরকে বা ৯৯৯ এ কল দেওয়ার আহব্বানও জানানো হয়েছে। এবারে বিজয়া দশমিতে আমরা রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছি, এর মধ্যে আমরা প্রতিমা বিসর্যন সম্পূর্ণ করবো। আমরা আশা করছি এবার আমরা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিগ্নে পূজা উৎযাপন করতে পারবো।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাস বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের সর্বস্তরের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। এবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাত ৭টার মধ্যে বিসর্জন এর সময় দিলেও এই সময়ের মধ্যে মহানরের সবগুলো মন্দিরের প্রতিমা এর মধ্যে বির্জন করা সম্ভব না, তাই আমরা জেলা প্রশাসকের, এসএমপি কমিশনার সহ সবার সাথে আলাপ করে রাত সাড়ে ৯টা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলার কোষাধ্যক্ষ বিদ্যুৎ কান্তি সেন বলেন, শ্রী চৌতন্য মহাপ্রভু, শাহজালাল ও শাহপরানের পূর্ণভূমি সিলেট। সম্পিতির মিলবো বন্ধনের শহর এটি। আমাদের মহানগরীর আকালিয়াতে এই সম্প্রিতির বন্ধনের উদাহরণ দেখা যায়, এক জায়গায় তিন ধর্মীয় উপাশনালয়। মন্দির, মসজিদ ও বৌদ্ধবিহার। এই সম্প্রিতির নগরে আমরা আশা করছি শান্তিপূর্ণ ভাবে এইবারে আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করব। আমরা সিলেটের মানুষ সম্প্রিতে বিশ্বাসী। আর প্রশাসন ও আমাদের সর্বচ্চ সহযোগিতা করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও আমাদের সহযোগিতা করছেন।
মৃৎশিল্পী শংকর পাল বলেন, দুর্গাপূজার আর খুব বেশি দিন নেই। রাত-দিন খেটে প্রতিমা গড়তে হচ্ছে। সময়ের সাথে লড়াই করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এবার বাঁশ, খড়, মাটি থেকে শুরু করে রঙ—সব কিছুর দাম অনেক বেশি। তাই প্রতিমা তৈরির খরচও বেড়ে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে অনেক জায়গায় অর্ডার কমেছে। অনেকে খরচ বাঁচাতে ছোট প্রতিমা নিচ্ছে। এই কাজ শুধু জীবিকার জন্য নয়, মনের টান থেকেও করি।
ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি আর মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হয়ে উঠতে যাচ্ছে সিলেট। প্রতিমা রূপায়ণ শেষ হলেই শুরু হবে সাজসজ্জা আর আলোকসজ্জার কাজ। শহরের প্রতিটি পূজামণ্ডপ জেগে উঠবে শারদীয় উল্লাসে। ভক্তদের হৃদয়ে প্রতীক্ষা একটাই— “কবে মা আসবেন? কবে বাজবে ঢাক, কবে মণ্ডপ ভরে উঠবে আনন্দধ্বনিতে?”
আজকের সিলেট /জেকেএস
শিপন চন্দ জয় 








