উৎপাদন খরচের চাপে চা শিল্প
রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৩:২৭ AM

উৎপাদন খরচের চাপে চা শিল্প

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০/০৬/২০২৬ ১১:২৫:২২ AM

উৎপাদন খরচের চাপে চা শিল্প


বাংলাদেশে চা উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৭০ বছর ধরে। চাষাবাদে আধুনিকতার ছোঁয়া ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদন বেড়েছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে আছে শিল্পটি। তবে তেলের দাম বৃদ্ধি, সার, কীটনাশক, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় চা বিক্রি করে খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে দাবি বাগান মালিক পক্ষের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৮৩৫ সালে চীন দেশের সীমানার বাইরে সর্বপ্রথম চা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানের বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় চা চাষের বিস্তার বাড়তে থাকে। একে একে গড়ে তোলা হয় ১৬৮টি চা বাগান।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১০ কোটি ২ লাখ কেজি, ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি এবং ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছর ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার আগাম বৃষ্টি হয়েছে। ফলে গতবছরের তুলনায় এবার চা উৎপাদন বেশি হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। অর্থাৎ ২০২৩ সালের পর থেকে চা উৎপাদন বাড়ছে।

বোর্ড সূত্র আরও জানায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে প্রতিকেজি চা নিলামের গড় মূল্য ছিল ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ২০২ টাকা ৪৬ পয়সা এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সা গড় মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ বিগত ১০ বছরের তুলনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামে এবছর বিক্রি হচ্ছে চা।

বর্তমানে শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি পাচ্ছেন ১৭৮ টাকার ওপরে। ২০২২ সালে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। এ মজুরিতেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শ্রমিকরা।

চা শ্রমিক পূর্ণিমা রেলি, জাদব রবিদাস ও অঞ্জু বলেন, ‌‌‘বর্তমানে আমরা যে পরিমাণ মজুরি পাই তা যথেষ্ট নয়। এই মজুরিতে ডালভাত খেয়ে বেঁচে থাকা দায়। প্রতি বছর বাড়ানোর কথা থাকলেও তা করা হয় না। বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা সময়মতো দেওয়া হয় না।’

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘চা শিল্পের অবস্থা গত কয়েকবছরের তুলনায় এখন ভালো আছে। উৎপাদন ভালো হচ্ছে। তবে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি বাড়ছে না। প্রতিবছর মজুরি পাঁচ শতাংশ বাড়ানোর কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।’

চা বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা উৎপাদনে যদি ১০০ টাকা খরচ হয়, তাহলে ৮০ টাকা শ্রমিকদেরকে দিতে হচ্ছে। বাকি ২০ টাকা অন্যান্য খাতে ব্যয় হচ্ছে। চা বাগান শিল্পকে কৃষির আওতায় নিলে হয়তো কম লাভে ঋণ পাওয়া যেত। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে চায়ের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে জানান তারা।

কথা হয় চাতলাপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চা উৎপাদন বেড়েছে ঠিক, তবে চা বাগানগুলোর অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছে না। কারণ চা শিল্পে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। হয়তো হাতেগোনা কয়েকটি বাগান ভালো চলছে। তবে বেশিরভাগ বাগানের অবস্থা একই। যতক্ষণ পর্যন্ত চায়ের দাম বৃদ্ধি না পাবে, ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যা থেকেই যাবে।’

তিনি আরও বলেন, অনেক বাগান কোয়ালিটি রক্ষা করে চা বানাতে পারে না। এজন্য দাম কম পাচ্ছে। আবার কেউ চা বানানোর পর বিক্রি হলো না, তখন দুই দিক থেকেই লোকসান হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, তেলের দাম বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ার পর অনেক চা বাগান চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে গুণগত মান রক্ষা করে চা উৎপাদন বাড়ানো হলে হয়তো বাগান মালিকদের ক্ষতি কম হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ চা বোর্ডর ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা) সুমন সিকদার বলেন, ‘এবছর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন বেশি হবে বলে আশা করি।’

বাংলাদেশ চা বোর্ডর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। চা শিল্পকে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে রক্ষা করা, জলাবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া, যেখানে পানি নেই সেখানে পানি সংগ্রহ করা— সবগুলোই হচ্ছে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। সবগুলো সমাধান করে শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার আমরা তা করছি।’

আজকের সিলেট/ডি/এসটি

সিলেটজুড়ে


মহানগর