মৌলভীবাজারে বেপরোয়া বালু লুট, হুমকিতে নদী ও পাহাড়ি ছড়া
বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৪৭ AM

মৌলভীবাজারে বেপরোয়া বালু লুট, হুমকিতে নদী ও পাহাড়ি ছড়া

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২/০৮/২০২৬ ১১:০২:১২ AM

মৌলভীবাজারে বেপরোয়া বালু লুট, হুমকিতে নদী ও পাহাড়ি ছড়া


মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর বিভিন্ন এলাকা এবং জেলার প্রায় শতাধিক পাহাড়ি ছড়া থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও তীরবর্তী মানুষের ঘরবাড়ি।

সরকারি তালিকা অনুযায়ী মৌলভীবাজার জেলায় ২৭টি বালু মহাল রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব অনুমোদিত বালু মহালের বাইরে প্রায় শতাধিক স্থান থেকে নিয়মিত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষ করে জেলার পাহাড়ি ছড়াগুলো থেকে সিলিকা বালু লুটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অর্ধশতাধিক ছড়া থেকে রাতের আঁধারে একটি চক্র বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলায় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর অনুমোদিত ৩৩টি সিলিকা বালু কোয়ারি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০১৩ সালে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মৌলভীবাজার জেলার ৫১টি পাহাড়ি ছড়াকে সিলিকা বালু সম্পৃক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৯টি ছড়া অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ইজারাগ্রহীতাদের অনিয়ন্ত্রিত ও বেআইনি বালু উত্তোলনের কারণে কমলগঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ জনস্বার্থে রীট পিটিশন দায়ের করে বেলা। শুনানি শেষে একই বছরের ২১ মার্চ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ১৯টি বালুমহালকে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) ও পরিবেশগত ছাড়পত্র (ইসিসি) ছাড়া পরবর্তী ইজারা না দেওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

তবে উচ্চ আদালতের ওই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগরসহ ৭টি উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে সিলিকা বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে ৩ আগস্ট রাতে মনু নদীতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মধ্যরাতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত একটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে।

একই দিনে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের চাতলাপুর এলাকায় মনু নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, মজুত ও পরিবহনের অভিযোগে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও তার ছেলেকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আরও একজনকে সাতদিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ৩১ জুলাই শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের আলিসার কুল (বরপাড়া) এলাকায় অবৈধভাবে উত্তোলন করা আট হাজার ঘনফুট বালু, একটি এক্সক্যাভেটর মেশিন, বালু উত্তোলনের মেশিন ও পাইপ জব্দ করা হয়।

এছাড়া ৩০ জুলাই উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নে শেভরন গ্যাস কোম্পানি ও গারো লাইনের মধ্যবর্তী স্থান থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা আনুমানিক ৬০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নে ১৩ জুলাই বিনা অনুমতিতে মাটি ভরাট ও বালু উত্তোলনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর বাইরেও সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনকারী চক্রটি অত্যন্ত বেপরোয়া। ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে নদী থেকে এবং শ্রমিক দিয়ে পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের পর ট্রলার, ট্রাক, পিকআপ, ট্রলি ও ঠেলাগাড়িতে করে তা বিভিন্ন স্থানে পরিবহন ও বিক্রি করা হচ্ছে।

স্থানীয়রা আরও জানান, প্রশাসনের অভিযান সম্পর্কে আগেই খবর পেয়ে যায় বালু উত্তোলনকারীরা। ফলে প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তারা সরে যায়। অভিযান শেষ করে প্রশাসনের সদস্যরা চলে গেলে আবারও শুরু হয় বালু উত্তোলন ও বিক্রি।

কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রুমান মিয়া বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে তারা মানববন্ধন করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও এতে স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যারা বালু উত্তোলন করছে, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। জেলার ছড়াগুলো থেকে নিয়মিত সিলিকা বালু লুট হচ্ছে। অথচ এসব বালু প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তা রক্ষায় যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা’র সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক এড. শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, ইজারা ছাড়া বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। এটি বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের। যারা অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ করে দিচ্ছেন, তারা উচ্চ আদালতের রায়কে অবমাননা করছেন।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাহাড়ি ছড়া রয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। সেখানে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলনের বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, সিলিকা বালুর কোয়ারি খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো থেকে ইজারা দেওয়া হয়। যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহেও কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল গণমাধ্যমকে বলেন, যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যারা বালু মহাল ইজারা নিয়েছেন, তাদের নির্দিষ্ট তফশিল ও শর্ত মেনে বালু উত্তোলন করতে হবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


আজকের সিলেট/ জেকেএস

সিলেটজুড়ে


মহানগর